সেবা নিয়ে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:০০ | আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৩:০৮

গাজী শাহনেওয়াজ

কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের শীর্ষ সেলফোন কোম্পানি গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রাহকদের নানা অভিযোগ। সময়ে সময়ে গ্রাহকদের ভর্ৎসনাও শুনতে হচ্ছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসিও গ্রামীণফোনের ওপর ক্ষুব্ধ। তারপরও সেবার মানে উন্নতি নেই সংস্থাটির।

এদিকে গ্রামীণফোনের কাছে সরকারের পাওনা ১২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংস্থাটি ওই টাকা দিতে রাজি নয়। পরে এ ব্যাপারে আদালতের শরণাপন্ন হলে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের পাওনা ২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু সেই টাকা পরিশোধেও গরিমসি করছে গ্রামীণফোন। এবার গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ তুলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। গত মাসে সংসদীয় কমিটির চতুর্থ সভায় বেসরকারি সেলফোন কোম্পানি গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের নিরবিচ্ছিন্ন সেবা প্রদানে ব্যর্থতা এবং কলড্রপ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে।

কমিটির ভাষ্যমতে, রবি-আজিয়াটা, সিটিসেল ও বাংলালিংকের তুলনায় বেশি কলড্রপ এই প্রতিষ্ঠানটির। নিরবিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে যেসব এলাকায় কলড্রপ হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করতে মন্ত্রণালয় থেকে কারিগরি টিম গঠনের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

জবাবে গ্রামীনফোণ কর্তৃপক্ষ কমিটিকে আশ্বাস দিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে আরো বেশি সর্তক হবেন এসব বিষয়ে তারা এবং প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় মনোনিবেশ করবেন। গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় নিজেদের প্রযুক্তির উন্নতি না করায় গ্রাহক হারাচ্ছেন প্রতিনিয়ত সংস্থাটি। নম্বর ঠিক রেখে অপারেটর বদলে রবি-আজিয়াটা, টেলিটক ও বাংলালিংকের চেয়ে বেশি গ্রাহক খুইয়েছেন গ্রামীণফোন; এর মূল কারণ নেটওয়ার্ক দুর্বলতা ও কলড্রপ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সভায় উপস্থিত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপে জানা যায়, সেদিনকার সভাতে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন এ কমিটির খোদ সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ। তিনি কিছুটা আক্ষেপের সঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে উদ্দেশ করে সেলফোন কোম্পানি গ্রামীণফোনকে নির্দেশ করে বলেন, মহানগরী থেকে তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১১ আসনের দূরত্ব মাত্র ছয় কিলোমিটার। রাজধানীর নিকটবর্তী এই এলাকায় গ্রামীণফোনের কোনো নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। এটা দুঃখজনক। কমিটির সভাপতি বলেন, কলড্রপ কিংবা নিরবিচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া কষ্টকর কিছু নয়। মন্ত্রণালয় আন্তরিক হলে কিংবা কারণ খতিয়ে দেখতে কারিগরি টিম গঠন করা হলে এবং ওই টিম গ্রামীণের কারিগরি টিমের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে সংকট সমাধান সম্ভব। সভাপতি আরো বলেন, এগুলো হালকাভাবে না নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দায়ীদের অনুশাসন দিতে সুপারিশ জানান।

সভাপতির সঙ্গে অভিন্ন মত দেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক। তিনি পদাধিকার বলে এ কমিটির সদস্য। এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে দেখা যায় গ্রামীণফোনের (জিপি) চেয়ে রবি, টেলিটক, বাংলালিংকের কলড্রপের রেট কম। সবচেয়ে বেশি কলড্রপ জিপির। কমিটির সংসদীয় কমিটির সভাপতির চেয়ে একধাপ এগিয়ে আরো বলেন, আর্থিক (ফাইন্সাসিয়াল) অডিটের সঙ্গে প্রযুক্তির (টেকনোলজি) সমন্বয় ঘটিয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করা উচিত। রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর স্থান সংসদ ভবন, গণভবন এরিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয় নেটওয়ার্ক নিরবিচ্ছন্ন রাখতে তাগিদ দেন গ্রামীণফোনকে।

তবে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বাহাসে না জড়িয়ে তাদের ব্যর্থতার কথা সংসদীয় কমিটির চতুর্থ সভায় অকপটে স্বীকার করেন নেন গ্রামীণফোনের নির্বাহী পরিচালক হোসাইন সাহাদাৎ। কোম্পানির অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, জিপির ঘন ঘন কলড্রপ, নেটওয়ার্ক ও কলরেট সম্পর্কে কিছুটা অভিযোগ আসে তাদের কাছে। তবে সেসব অভিযোগ যৌক্তিকভাবে গ্রাহকদের বুঝিয়ে সমাধান করে দেওয়া হয়।

এরপরও তাদের নিজস্ব কিছু সমস্যা রয়েছে বলে কমিটিকে অবহিত করেন। বলেন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি ও গ্রামীণফোন সবসময় জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে থাকে। ভবিষ্যতে আরো বেশি আধুনিকতার স্পর্শে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার কাজ করতে তারা সরকার ও গ্রাহকের কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। পরে দুই পক্ষের আলোচনার পর সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে গ্রামীণফোনকে নিরবিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সেবা প্রদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ জানায়। পাশাপাশি কমিটির আগামী সভায় গ্রাহকসেবা সংস্থার কলরেট, কলড্রপ ও নেটওয়ার্কের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে একটি তথ্য-নির্ভুল রিপোর্ট প্রদানের সুপারিশ জানায়।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি গ্রামীণফোনের সেবা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সবচেয়ে বেশি কল ড্রপের ভোগান্তি এ সেবা সংস্থা বলে উল্লেখ করেছি। পাশাপাশি তারা বলেছিলেন, তাদের (জিপি) ডায়াল করা নম্বরে সংযোগ পেয়েও অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়।

গত বছরের ৬ থেকে ৮ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার ১৫টি এলাকায় বিটিআরসি কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) পরীক্ষা চালায়। এতে যান্ত্রিকভাবে ৯০ সেকেন্ডের ৩ হাজার ৩০০টি কল করা হয়।

পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী, দেশের সর্ববৃহৎ অপারেটর গ্রামীণফোনের কল ড্রপ হার ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে রবির কল ড্রপ হার ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, বাংলালিংকের শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিটকের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অথচ বিটিআরসি ও ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) কর্তৃক কল ড্রপের সর্বোচ্চ নির্ধারিত সীমা ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরো বলেছিল, গ্রামীণফোনে সংযোগের জন্য গড় ১০ দশমিক ১৪ সেকেন্ড সময় লেগেছে। পাশাপাশি রবিতে ৬ দশমিক ১৫ সেকেন্ড, বাংলালিংকে ৭ দশমিক ৬৯ সেকেন্ড ও টেলিটকে ৭ দশমিক ১১ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়েছে। ডায়াল করা নম্বরে সংযোগ পাওয়ার জন্য বিটিআরসির আদর্শ অপেক্ষার সময় ৭ সেকেন্ড।

বিটিআরসির ওই প্রতিবেদন প্রকাশের মাঝপথে ৯ মাস পার হলেও গ্রামীণফোনের সার্ভিসের কোনো উন্নতি করেনি। প্রতিষ্ঠানটি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে বলে গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকার তাদের লাগাম টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। এখন সংসদীয় কমিটির সুপারিশ কতটুকু গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় সহায় হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে সাধারণ গ্রাহকদের। এছাড়া গ্রাহকদের অপারেটর বদলের সুযোগ রেখে এমএনপি চালু করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর বদলে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে ব্যর্থতার কারণে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক হারায় গ্রামীণফোন। বিটিআরসির তথ্যমতে, এমএনপি চালুর প্রথম তিন মাসে এই সংস্থাটির গ্রাহক হারিয়েছিল ৪৯ হাজার ৬৫৮ জন।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় গ্রামীণফোনের মহাখালী-তেজগাঁও শিল্প এলাকার সেবা সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে। তারাও তাদের সার্ভিসের ত্রুটির কথা স্বীকার করেন। বলেন, খুদেবার্তা (এসএমএস) নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তাৎক্ষণিক সেন্ট হয় না। সঙ্গে কলড্রপের অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। তবে এ সমস্যা বেশি দিন থাকবে না; তাদের ৪জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্টরা জানান। তারা বলেন, নম্বর ঠিক রেখে অপারেটর বদলের সুযোগ থাকায় আমরা প্রতিনিয়ত গ্রাহক হারাচ্ছি, যোগ করেন জিপির সার্ভিস সেন্টারের দায়িত্বরতরা।

পিডিএসও/হেলাল