এক ছাতার নিচে আসছে সেলফোন সেবা

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:০৪

গাজী শাহনেওয়াজ

দেশে ডিজিটাল ও সেলফোন সেবায় সব প্রজন্মের নেটওয়ার্ককে এক ছাতার নিচে রাখতে প্রণয়ন করা হচ্ছে অভিন্ন নীতিমালা। এ কাজের খসড়া তৈরির কাজ শেষ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। কয়েক দফায় সংস্কার চলবে এ প্রস্তাবনার। প্রথম পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

সরকার, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিটিআরসির লক্ষ্য এক্ষেত্রে অভিন্ন। কারণ প্রযুক্তির প্রসারে দেশ যাতে পিছিয়ে না থাকে সবাই এ ইস্যুতে একাট্টা। সময়ের ব্যবধানে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের উত্তরণ ঘটছে এবং কাজের ধরনও অভিন্ন। তাই সরকারের পাশাপাশি স্টেকহোল্ডাররাও ওই পথে হাঁটছে। এদিকে গ্রাহকদের কাছ থেকে এন্তার অভিযোগ রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সেবা পাওয়াতে। আর বর্তমানে ৪জি নেটওয়ার্ক ততটা কার্যক্রম নেই। ২জি ও ৩জি’র অবস্থা আরো নাজুক। তবু বিশ্বের সঙ্গে তালিয়ে চলতে পঞ্চম প্রজন্মের (৫জি) নেটওয়ার্ক মনরক্ষার্থে চালু করতে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এতে প্রযুক্তির উত্তরণ ঘটলেও ২জি থেকে ৪জি কিংবা আসন্ন ৫জি নেটওর্য়াক পরিচালিত হচ্ছে স্বতন্ত্র গাইডলাইন ও ভিন্ন নীতিমালার আলোকে। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের প্রসারে দফায় দফায় নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ পুরোনো ধ্যান-ধারণার অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সময় ও অর্থ দুটিরই অপচয় হচ্ছে। তাই সব নেটওয়ার্ককে এক ছাতার আওতায় আনতে নতুন করে শুরু হয়েছে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ।

মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসির তথ্য মতে, দেশে পাঁচটি সেলফোন অপারেটর তাদের তত্ত্বাবধানে গ্রাহককে নেটওয়ার্ক সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গ্রামীণ, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও টেলিটক। তবে নীতিমালা লঙ্ঘনের অপরাধে বর্তমানে সিটিসেলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে চালু হওয়া ২জি নেটওয়ার্ক পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে, চারটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩জি এবং চারটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে ৪জি-এলটিই সেলুলার মোবাইল ফোন অপারেটর লাইসেন্স কার্যকর রয়েছে। এরই মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোবাইল অপারেটররা তাদের অনুকূলে বরাদ্দ করা তরঙ্গকে প্রযুক্তি নিরপেক্ষ তরঙ্গে রূপান্তর করেছে।

সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে, প্রযুক্তির দ্রুত ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় সব সেলুলার মোবাইল ফোন সার্ভিসেস গাইডলাইনস ও লাইসেন্সগুলোকে একীভূত করার। গত বিটিআরসি কমিশনের ২১৩তম সভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে মোবাইল ফোনের ২জি, ৩জি ও ৪জি-এলটিই প্রযুক্তিনির্ভর গাইডলাইন প্রস্তুতের লক্ষ্যে একটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটি একাধিক সভা করে কমিশন সংশ্লিষ্ট বিভাগ-শাখা হতে মতামত নিয়ে খসড়া সেলুলার মোবাইল ফোন অপারেটর লাইসেন্সিং গাইডলাইন প্রস্তুত করে। প্রণীত এই গাইডলাইন সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

বিটিআরসির পাঠানো গাইডলাইন নিয়ে এরই মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে দেশের মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো। মন্ত্রণালয়ের এ সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে খোঁজখবর রাখছেন যাতে এটি চূড়ান্ত করার আগে তাদের মতামত প্রদানে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ অনেক সময় নীতিমালা বা স্পর্শকাতর অনেক ইস্যুতে সব প্রক্রিয়া শেষ করে বাস্তবায়ন করা সংক্রান্ত সভায় স্টেকহোল্ডারদের ডেকে তাদের মতমত নিয়ে উদ্যোগটি কার্যকর করা হয়। এতে তাদের মতামত উপেক্ষিত থেকে যায়।

অভিন্ন নেটওয়ার্ক গাইডলাইনের ক্ষেত্রে যাতে অতীতের মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সেজন্য সেলফোন অপারেটর প্রতিনিধিদের ওই দৌড়ঝাঁপ বলে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, অন্তত তাদের মতামত নেওয়ার জন্য পৃথক সভা না করলেও অন্তত ওয়েবসাইটে প্রস্তাবনা দেওয়ার পর সময় দিয়ে তাদের মতামতগুলোকে আমলে নেওয়া হয়।

তবে মন্ত্রণালয় বলছে ভিন্ন কথা। এই অভিন্ন নীতিমালা সহজে কার্যকর হবে না। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে আগামী ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। কারণ ৪জি গাইডলাইনের যে চুক্তি রয়েছে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেটা ওই সময়ে শেষ হবে। অভিন্ন নীতিমালা চালু হোক সেটা তারাও চায়। তবে ওই সময়ের আগে স্টেকহোল্ডারসহ সবাইর মতামত নেবে মন্ত্রণালয়। আর বিটিআরসির পাঠানো প্রস্তাবনাটি টেলিযোগাযোগ অধিদফতরে (ডট) মতামত নিতে পাঠাবে মন্ত্রণালয়। তারা আশা করছেন, সব প্রক্রিয়া শেষ করে এনে অভিন্ন নীতিমালা সব প্রজন্মের জন্য কার্যকর করতে ওই সময়ও যথেষ্ট।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে আমরাও চাই। তবে সেটা ২০৩৩ সালের আগে সম্ভব নয়। কারণ ৪জি নেটওয়ার্ক সেবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আমাদের ওই সময় পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে। এরই মধ্যে বিটিআরসি এ সংক্রান্ত প্রস্তাব আমাদের কাছে পাঠিয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞ এই মন্ত্রী বলেন, অভিন্ন নীতিমালা হলে এর সুফল পাবে সরকার, গ্রাহকসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ বর্তমানে এক-একটির আলাদা আলাদা ফি ও নীতিমালা রয়েছে। সেগুলোকে একীভূত করা হলে এ সংশ্লিষ্টদের সময় ও অর্থ দুটিরই সাশ্রয় হবে, যোগ করেন বিজয় বাংলার জনক এই মন্ত্রী।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই ৫জি প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। জানা যায়, আফ্রিকানরা ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম ভোডাকম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ৩জি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৩জি ভিডিও কল হিসেবে। একই বছরে ইনটেল লিমিটেড বাণিজ্যিকভাবে এ প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। এশিয়াতে ৩জি প্রযুক্তি ভালোভাবেই ব্যবহার হচ্ছে। অনেক কোম্পানি যেমন মেক্সিজ, ভোডাফোন, এয়ারটেল, ডকোমো, এয়ারসেল, রিলায়েন্স এটার সেবা দিচ্ছে। ২০০৮ সালের মে মাসে চীন সরকার ঘোষণা দেওয়ার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে দেশটি তিনটি কোম্পানিকে লাইসেন্স প্রদান করে। ভারত-ও ওই সময়ে ৩জি চালু করে। আমরা অনেক পরে শুরু করলেও বর্তমানে ৪জি চালু রয়েছে। আর ৫জি নেটওয়ার্ক চালু করতে চলছে চিঠি চালাচালি।

পিডিএসও/হেলাল