ফাইভজি প্রস্তুতি শুরু

উন্নত বিশ্বের সমতা আসছে নেটওয়ার্কে

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:০৯ | আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:৩৭

গাজী শাহনেওয়াজ

কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া নিয়ে ৪জি নেটওয়ার্ক গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগের মধ্যেও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি) ৫জি অর্থাৎ পঞ্চম প্রজন্মকে উন্নত নেটওয়ার্কে যুক্ত রাখতে তৎপরতা শুরু করেছে। এ কার্যক্রম চালু হলে নেটওয়ার্ক সেবায় বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমতায় পৌঁছাবে বাংলাদেশ।

তবে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ও কোয়ালিটি অব সার্ভিসের অবস্থায় ৪জির জায়গায় ৩জি পাওয়া দুষ্কর। এ অবস্থায় ৫জি চালুর সিদ্ধান্তকে কঠোর সমালোচনা করছেন তারা।

জানা গেছে, আগামী বছরের সুবিধাজনক সময়ে ৫জি সেবা চালু করতে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের জন্য বিটিআরসির কমিশনারকে (স্পেকট্রাম ডিভিশন) আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন হয়েছে; কমিটির অন্যরা হলেন—সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব, ইন্টারনেট সেবাদানকারীদের সংগঠন আইএসপিএবির প্রতিনিধিরা। কমিটি আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এ বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাছে জমা দেবে।

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালা প্রণয়ন কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। তবে ৫জি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া কমিটি এ সময়ের মধ্যে ৫জি প্রবর্তনের রূপরেখা, এর জন্য সম্ভাব্য তরঙ্গ, তরঙ্গের মূল্য এবং বাস্তবায়নের সময় সম্পর্কে একটি প্রস্তাবও প্রস্তুত করবে।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এ বিষয়ে বলেন, আগামী প্রজন্মকে উন্নত নেটওয়ার্ক সেবায় যুক্ত রাখতে তৎপর সরকার। ইতোমধ্যে ৫জি নেটওয়ার্ক কার্যক্রম শুরু করতে গঠিত কমিটিকে নীতিমালা প্রণয়নে সব ধরনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা রাখবে মন্ত্রণালয়। কবে নাগাদ এর কার্যক্রম শুরু করবেন—এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা আছে দেশে ২০২৩ সালের মধ্যেই ৫জি চালু করা হবে। আমরা সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।’

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশে ৫জি সেবা চালু রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ায় ৫জির লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে অপারেটরদের ৩৩০০-৪২০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে প্রায় ১০০ মেগাহার্জ এবং মিলিমিটার ওয়েভের জন্য ২৬-২৮ গিগাহার্জ তা তদূর্ধ্ব ব্যান্ডে ৮০০ মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে কয়েকটি দেশ ২.৫ গিগাহার্জ (২৫০০-২৬৯০ মেগাহার্জ) ব্যান্ডে ৫জির তরঙ্গে এ কার্যক্রম চালু রাখতে চাইছে। বিটিআরসির যুক্তি হচ্ছে, ৫জি প্রযুক্তির জন্য শুধু তরঙ্গের প্রাপ্যতাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত থাকা আবশ্যক। এদিক থেকে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে থাকলেও সমসাময়িক সময়ে ৫জি প্রযুক্তি প্রবর্তনে কমিশন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বল্প খরচে মোবাইল কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক স্থাপনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হারমোনাইজড করা অর্থাৎ একই তরঙ্গ ব্যাপক ভিত্তিতে ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ কাজ সহজতর করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ)। সেখানে অন্যান্য দেশের মতো এখানেও তরঙ্গ প্রদানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া মিলিমিটার ওয়েভের জন্য প্রস্তাবিত ব্যান্ডসমূহে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত তরঙ্গ আছে।

নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আশা করছে, চলতি বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড রেডিও কনফারেন্স-২০১৯ (ডব্লিউআরসি-১৯) এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করবে। এ ক্ষেত্রে আইটিইউ-এর ২৫০০-২৬৯০ মেগাহার্জ, ৩৩০০-৪২০০ মেগাহার্জ, ৩২ গিগাহার্জ, ৩৮ গিগাহার্জ, ৪০ গিগাহার্জ এবং ৪৩ গিগাহার্জ ব্যান্ডসমূহে ৫জি প্রযুক্তির জন্য তরঙ্গ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিটিআরসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল ফোন প্রযুক্তির ৩জি ও ৪জির তুলনায় ৫জি প্রযুক্তির সম্প্রসারণে বাড়তি তরঙ্গ লাগবে। নির্বিঘœ সেবার জন্য অপারেটর প্রতি নির্ধারিত ব্যান্ডের ১০০ মেগাহার্জ পর্যন্ত তরঙ্গ প্রয়োজন হতে পারে, যা ৩জি ও ৪জির তুলনায় ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি। ৫জির কার্যক্ষমতাও হবে ৪জির তুলনায় ন্যূনতম ১০ গুণ বেশি। আইটিইউ ৫জির জন্য বিস্তারিত কভারেজসহ সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তরঙ্গ ব্যান্ডের তিনটি ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মধ্যে লো ব্যান্ড ও মিড ব্যান্ড ৫জির জন্য ৩.৫ গিগাহার্জ ব্যান্ডের তরঙ্গ ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এ ব্যান্ডকে উৎকৃষ্ট ভাবা হচ্ছে।

এর আগে ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রবির সহায়তায় দেশে প্রথমবারের মতো ‘৫জি’ পরীক্ষা ও সেবা প্রদর্শন করে প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। প্রদর্শনীতে ‘৫জি’-এর গতি ছিল ৩ দশমিক ৮৯ জিবিপিএস থেকে ৪ দশমিক শূন্য ৯ জিবিপিএস। ওই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন, ‘যদি দেশের মানুষ ভোট দিয়ে আমাদের আবারও ক্ষমতায় আনে, তবে আমরা দেশে ৫জি মোবাইল ফোনসেবা চালু করব। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৪জির মতো বিলম্বিত অবস্থানে নয়, প্রথম অবস্থানেই থাকবে বাংলাদেশ। বিটিআরসির নেওয়া উদ্যোগ সজীব ওয়াজেদ জয়ের অঙ্গীকারের প্রথম পদক্ষেপ।

এদিকে, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ও কোয়ালিটি অব সার্ভিস এতটাই খারাপ যে, ৪জির জায়গায় ৩জি পাওয়া দুষ্কর। এ অবস্থায় ৫জি চালুর সিদ্ধান্ত হবে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে কোয়ালিটি অব সার্ভিস যদি মাপা হয়, তাহলে দেখা যাবে সেটা যেকোনো সময়ের চাইতে অনেক নিম্নমানের। নিয়ন্ত্রক সংস্থা একদিকে পাওনা আদায়ের জন্য দুটি অপারেটরের লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আবার অন্যদিকে ৫জি চালুর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। বিষয়টি এমন যে, যে ডালে বসে আছেন সে ডালই আপনি কাটছেন। এনওসি বন্ধের ফলে তারার আর নতুন করে স্পেকট্রাম ক্রয় করতে পারবে না এমনিতেই। রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটক এখনো ৪জি চালু করতে পারেনি। গ্রাহকদের ৯০ শতাংশ এখনো ৪জি সেবা গ্রহণ করেননি। ৫জির ডিভাইস দেশে পর্যাপ্ত নয়, তাও আবার অতি উচ্চমূল্যে।

পিডিএসও/হেলাল