এক সফটওয়্যারে ৩৮ লাখ গার্মেন্টকর্মীর তথ্য

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৯, ১০:৫০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার কর্মী সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। এর মধ্যে ৩৮ লাখ কর্মীর একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এই ডেটাবেজে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর (এনআইডি), ছবি, আঙুলের ছাপ, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বর, কোন কারখানায় কী পদে চাকরি করেন, আগে কোথায় চাকরি করেছেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশেষ দক্ষতা, দেশের কোন এলাকা থেকে এসেছেন ইত্যাদি তথ্য। ফলে এখন যেকোনো গার্মেন্টকর্মী সম্পর্কে জানতে সরাসরি তার সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন নেই। ডেটাবেজে লগইন করে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সব তথ্য পাওয়া যাবে। এরই মধ্যে সফটওয়্যারটি অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও।

এই ডেটাবেজ সফটওয়্যার তৈরি করেছে এ দেশেরই একটি সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিসটেক ডিজিটাল। ‘বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি অ্যান্ড ওয়ার্কার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এমপ্লয়ি ডেটাবেজ’ নামের এই সফটওয়্যারটি বর্তমানে দেশের প্রায় ২ হাজার ৪০০ তৈরি পোশাক কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে টাইগার আইটি নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের আগে দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ হতো। ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা প্রায় লেগেই থাকত। সৃষ্টি হতো অচলাবস্থা। সে সময় এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সঙ্গে গবেষণা করে ওই বছরই এই ডেটাবেজ সফটওয়্যার তৈরি শুরু করে সিসটেক ডিজিটাল। তাদের সঙ্গে ছিল টাইগার আইটি। এই ডেটাবেজে যুক্ত হয় তৈরি পোশাককর্মীদের তথ্য।

এরপর থেকে কোনো পোশাক কারখানায় বিশৃঙ্খলা বা শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে, ডেটাবেজ থেকে তা সহজেই খুঁজে বের করা হয়। জড়িতদের নামের পাশে ‘অপকর্ম’ যুক্ত করা হয়। ফলে সহজেই তাদের চিহ্নিত করতে পারছেন অন্যান্য কারখানার মালিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এই প্রক্রিয়ায় পোশাক খাতের অযাচিত বিশৃঙ্খলা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বলা যায় এ খাত এখন শান্ত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ঢাকার আশুলিয়া এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে এই সফটওয়্যার চালু করা হয়। সংশ্লিষ্টদের গবেষণায় ওঠে এসেছে, আশুলিয়া এলাকার কারখানাগুলো থেকেই শ্রমিক অসন্তোষের উদ্ভব হয়। ওই এলাকায় তখন ২৮৫টি কারখানা ছিল। ২০১১ সালে প্রাথমিকভাবে এখানকার কারখানাগুলোতে এই সফটওয়্যারের ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালের পরে সারা দেশের কারখানাগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, শুধু যেসব কারখানা তৈরি পোশাক রফতানি করে, তাদের জন্য এই সফটওয়্যারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সফটওয়্যারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বিজিএমইএ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি আরশাদ জামাল দিপু বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে শ্রমিক মাইগ্রেশন (কোনো কিছু না জানিয়ে দল বেঁধে এক কারখানা থেকে শ্রমিকদের অন্য কারখানায় যোগদান করা) রোধ করতে এই ডেটাবেজ ব্যবহার করা হয়। শ্রমিক মাইগ্রেশন ঠেকানো, অসন্তোষ দূর করা, চিহ্নিত শ্রমিকদের অপকর্ম সম্পর্কে তথ্য জানা এই সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণে সহজ হয়। এভাবেই সফটওয়্যারটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

তিনি জানান, বর্তমানে শ্রমিকদের বিমা দাবি, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহায়ক ফান্ড পেতে সহযোগিতা করছে এই সফটওয়্যার। শ্রমিকদের জন্য কল্যাণ তহবিলের কথা উল্লেখ করে আরশাদ জামাল দিপু বলেন, আমরা ৩০০ কোটি টাকার একটি কল্যাণ তহবিল তৈরি করতে যাচ্ছি। গত বছর এ খাত থেকে আমাদের আয় হয়েছে ১৬৩ কোটি টাকা। এ বছর আশা করছি, ১৫০ কোটি টাকা আয় হবে। কল্যাণ তহবিল থেকে শ্রমিকদের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হলে এই ডেটাবেজ সফটওয়্যার ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি আরো জানান, এই তহবিল থেকে আপৎকালীন ফান্ডে ৫০ শতাংশ ও সুবিধাভোগী ফান্ডে ৫০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিজিএমইএ কর্র্তৃপক্ষ সুবিধাভোগী ফান্ডকে মোট তহবিলের ৭০ শতংশে উন্নীত করতে চায়। এখানে ইনজুরি ইন্স্যুরেন্সের একটি বিষয় রয়েছে বলেও তিনি জানান। এসব তহবিল বরাদ্দ, বিলি করতে হলে শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রয়োজন। এই ডেটাবেজ সফটওয়্যার থেকেই সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি অ্যান্ড ওয়ার্কার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের জন্য বিজিএমইএ অর্জন করেছে অ্যাসোসিও পুরস্কার। ২০১৮ সালে ‘অ্যাসোসিও আউটস্ট্যান্ডিং ইউজার অ্যাওয়ার্ড’ ক্যাটাগরিতে এশিয়ান ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশন অ্যাওয়ার্ড পায় বিজিএমইএ। জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত অ্যাসোসিও ডিজিটাল মাস্টার্স সামিট-২০১৮ এ এই পুরস্কার গ্রহণ করেন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। ওই সময়ে উপস্থিত ছিলেন সহ-সভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাসির ও সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিসটেক ডিজিটালের প্রধান নির্বাহী এম রাশিদুল হাসান।

সিসটেক ডিজিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এম রাশিদুল হাসান বলেন, আমাদের এই সফটওয়্যার সলিউশনের দুটি সিস্টেম আছে। প্রথমত, প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে সফটওয়্যারটি ইনস্টল করা এবং দ্বিতীয়ত, এটি ক্লাউড সার্ভারে চলে। ফ্যাক্টরি সফটওয়্যারের সব ডেটা ক্লাউড সফটওয়্যারে আপলোড হয়ে আপডেট হয়। আপডেটেড ডেটা আবার ফ্যাক্টরি সফটওয়্যারে ডাউনলোড হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি হয় ‘অ্যান্ড টু অ্যান্ড’ এনক্রিপশনের মাধ্যমে ব্যাকগ্রাউন্ডে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে।

এছাড়া দুটি সফটওয়্যারের সব নতুন ফিচার ও বাগ ফিক্সিংও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদিত হয়। এটি ইউনিক একটি ফিচার, যার কারণে আমাদের সাপোর্ট সেন্টারের ওপর চাপ কম থাকে। তিনি আরো জানান, দেশে সফটওয়্যারটির সফল ব্যবহারের পর এবার খোঁজা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও চীনে সফটওয়্যারটির বাজার রয়েছে। জানা গেছে, শ্রীলঙ্কা এরই মধ্যে সফটওয়্যারটির ব্যাপারে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। শিগগিরই অন্য দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে দেশের সফটওয়্যার ও সেবা পণ্যের নির্মাতাদের সংগঠন বেসিসের সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, এটাই প্রমাণ করে, দেশের কোম্পানিগুলোর বড় বড় প্রজেক্ট করার সামর্থ্য আছে। তিনি আরো বলেন, দেশীয় সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর প্রতি স্থানীয় মার্কেটের আস্থার অভাব দেখা যায়। কিন্তু আমাদের সফটওয়্যার কোম্পানিও যে বড় বড় কাজ করতে পারে, সাফল্যের সঙ্গে হ্যান্ডেল করতে পারে সিসটেক তার বড় একটা উদাহরণ।

পিডিএসও/তাজ