চুরি-ছিনতাই হওয়া ডিভাইস যাচ্ছে বিদেশে

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০৮:৩০

জুবায়ের চৌধুরী

দেশে চুরি-ছিনতাই হওয়া ডিভাইসগুলো অনলাইন মার্কেটপ্লেস, ফুটপাতের দোকান, এমনকি নামিদামি শপিং কমপ্লেক্সে দেদার বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্য সেখানে সরাসরি বিক্রি করছে চোর ও ছিনতাইকারীরা। শুধু তা-ই নয়, এসব চোরাই ডিভাইস কেনাবেচায় ‘ভালো দাম’ পেতে পাচার হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালে। সেখানে এসব চোরাই পণ্যের রমরমা বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এমন ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ফোনের আইএমইআই নম্বর ট্র্যাকিং করে কিছু ডিভাইস উদ্ধার হলেও বেশরি ভাগই আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেক সময় ফোনের আইএমইআই নম্বরই পাল্টে ফেলছে প্রশিক্ষিত চক্রটি। এতে করে আইএমইআই নম্বর ট্র্যাক করে কাঙ্ক্ষিত ডিভাসটি উদ্ধারও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসব চোরাই মোবাইল কিনে কেউ যদি ভারতসহ যে কোনো দেশে ভ্রমণে গেলে সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সহজেই ধরা পড়তে পারেন।

জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ল্যাপটপ, ট্যাব ও মোবাইল ফোন চুরি-ছিনতাইয়ের পর তা চলে যায় ফুটপাতের দোকান থেকে বড় বড় সব শপিং সেন্টারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনেও চলছে চোরাই পণ্যের বিজ্ঞাপন, বিক্রিও হচ্ছে দেদার। ঢাকার গুলিস্তান স্টেডিয়ামের বাইরে, পাতাল মার্কেট, বঙ্গবাজার, মিরপুর শাহআলী মাজার, গাবতলী, উত্তরা, ওয়াইজঘাট ও চকবাজারের বেগমবাজারের ফুটপাতেই মেলে ভালোমানের চোরাই পণ্য। নামিদামি শপিং কমপ্লেক্সগুলোও পিছিয়ে নেই। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান এভিনিউ, মলি ক্যাপিটাল সেন্টার, ধানমন্ডির অরচার্ড পয়েন্টসহ বেশকিছু নামি শপিং কমপ্লেক্সের দোকানগুলোতেও পাওয়া যায় চোরাই পণ্য। সবখানেই মিলছে চোরাই পণ্য। দাম কম হলেও এসব পণ্যের গুণগতমান কিন্তু খারাপ নয়। আবার সব পণ্যই চোরাই নয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চোরাই বা ছিনতাই হওয়া নামিদামি ব্রান্ডের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ কিংবা অন্য ডিভাইস এজেন্ট বা চক্রের সহায়তায় পাশর্^বর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব কেনাবেচা এবং বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে মাধ্যম বা এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে গুলিস্তানের পাতাল মার্কেট, ভাসানী স্টেডিয়াম মার্কেটসহ আরো একাধিক মার্কেট-শপিংমলের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। আবার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকেও সে দেশের চোরাই পণ্য বাংলাদেশে ঢুকছে।

জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও কানসাটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এক শ্রেণির মোবাইল ব্যবসায়ী ভারতীয় চোরাই মোবাইলের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মোবাইল ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় কেনার জন্য পাবনা, নাটোর, ঈশ্বরদী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানের লোকজন ছুটে আসছে প্রতিদিন। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দুই একবার অভিযান চালালেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ মোবাইল ফোনসেটের বাণিজ্য। চোরাই মোবাইল কেনাবেচার সময় ব্যাটারি ও চার্জার দেওয়া হয় না। এমনকি পুরাতন চোরাই মোবাইলের ক্যাসিংও বদলে দেওয়া হয়। এতে করে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। এসব চোরাই মোবাইল কিনে কেউ যদি ভারত ভ্রমণে যান তবে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সহজেই ধরা পড়বেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) উপকমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন, গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী তিন ধরনের প্রক্রিয়ায় চোরাই বা ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোনসেট কেনাবেচা হয়ে থাকে। ২০০৮ সালের কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, সিঙ্গাপুরে চুরি হওয়া, ছিনতাইকৃত ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোন বাংলাদেশে বিক্রি হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশে চুরি-ছিনতাইকৃত যেমন আইফোন, স্যামসাংসহ নামিদামি ব্রান্ডের ফোন বাইরের দেশে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়াও অনেক সময় নামিদামি ফোনসেটের ডিসপ্লেসহ নানা যন্ত্রাংশ খুলে আলাদা করে ‘অরজিনাল’ হিসেবে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন মার্কেট-শপিংমলে।

ডিসি মশিউর রহমান বলেন, চোরাই বা ছিনতাইকৃত মোবাইল সেটের আইএমইআই নম্বরের সূত্র ধরে সাধারণত ফোনটির অবস্থান শনাক্তসহ সেটি উদ্ধার করা হয়। এর মাধ্যমে চোরাই ফোনসেট কেনাবেচায় জড়িতদেরও গ্রেফতার করা হয়। মূলত এই বিষয়গুলো এড়ানোর জন্যই চোর-ছিনতাইকারীরা এক দেশের পণ্য অন্য দেশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করছে। তাই এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি করছেন গোয়েন্দারা।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলিস্তানের পাতাল মার্কেটের একটি চক্রের মাধ্যমে দেশের ভেতরে চুরি-ছিনতাইকৃত নামিদামি মোবাইল ফোনসেট ভারত-নেপালসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। পাতাল মার্কেট ছাড়াও ভাসানী স্টেডিয়াম মার্কেট, ইস্টার্ন প্লাজাসহ আরো একাধিক মার্কেট বা শপিংমলে এই চক্রের সদস্যরা সক্রিয়। তারা এক দেশের চোরাই সেট আরেক দেশে বিক্রির সঙ্গে জড়িত। যাতে করে ধরা পড়ার আশঙ্কা কম থাকে। এছাড়া তারা ওইসব দামি ফোনসেটের ডিসপ্লে থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ উচ্চমূল্যে বিক্রির কাজ করে থাকে। অপরদিকে ওইসব মার্কেটের কিছু দোকানে এক ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করে ফোনসেটের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনসহ অনেক তথ্য পাল্টে চোরাই মোবাইলগুলো বিক্রি করা হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল