সরকারবিরোধী অপপ্রচার ঠেকাতে ‘রিয়াল টাইম মনিটরিং’

বিদেশে বসে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, ১২ জন শনাক্ত

প্রকাশ | ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:১২ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৩৪

জুবায়ের চৌধুরী

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার চালাচ্ছে একাধিক চক্র। এই অপপ্রচার চক্রের বেশির ভাগ সদস্যই বিদেশে থাকেন। সেখানে বসেই তারা সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট কিংবা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশ্বের ছয়টি দেশ থেকে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সাইবার অপরাধে সক্রিয় এমন ১২ জন প্রবাসীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে গোয়েন্দারা। তারা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আছেন। দেশে এলেই তাদের গ্রেফতারের প্রস্তুতি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

এদিকে দেশে-বিদেশে নাম পরিচয় গোপন করে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তকারীদের অপপ্রচারকারী ঠেকাতে অনলাইনে ‘রিয়াল টাইম মনিটরিং’ করছে আইনশৃঙ্খল বাহিনীর একাধিক বিশেষায়িত দল। সাইবার অপরাধ কমিয়ে আনতে র‌্যাব-পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। এসব দলকে দক্ষ, শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করতে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গঠিত র‌্যাবের ‘সাইবার নিউজ ভেরিফিকেশন সেন্টার’ এখনো অপপ্রচারকারী চক্রের সন্ধানে কাজ করছে। একইভাবে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ইউনিট ‘রাউন্ড দ্য ক্লক মনিটরিং’ করে যাচ্ছে। সাইবার প্যাট্রলিংয়ে ধরা পড়েছে নির্বাচনপরবর্তী সময়ে অপপ্রচারের নিত্যনতুন তথ্য। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে অ্যাকশনে যাচ্ছে র‌্যাব-পুলিশ।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশে বা দেশের বাইরে যেই অপপ্রচার চালাবে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তদন্ত করে গ্রেফতার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। দেশে সাইবার লিংক বন্ধ করার পাশাপাশি বিদেশ থেকে অপপ্রচার বন্ধেরও চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে বিদেশে শনাক্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে কূটনৈতিক চ্যানেলে রাষ্ট্রদূতদের চিঠি দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়া ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরোর (এনসিবি) মাধ্যমে ইন্টারপোলকে চিঠি দিয়ে কয়েকজন গুজব রটনাকারীকে দেশে ফেরত পাঠাতে বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার, গুজব, মিথ্যা তথ্য, উসকানিমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হলেই গ্রেফতার হবে সেই ব্যক্তি। তাছাড়াও বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট ‘রিয়াল টাইম মনিটরিং’ এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সত্য ঘটনা জনগণের সামনে তুলে ধরে বিভ্রান্তি দূর করা হবে। যেসব পেজ ও আইডি থেকে বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সেগুলোর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা এবং তাৎক্ষণিক বন্ধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব পেজ ও আইডির অ্যাডমিন শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে।

র‌্যাবের পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) মুফতি মাহমুদ খান জানান, সাইবার জগতে র‌্যাবের নজরদারি ও তদন্ত কার্যক্রম চলছে। অনেক সচেতন নাগরিক নিজ থেকেই গুজব ও অপপ্রচারকারীর বিরুদ্ধে তথ্য দিচ্ছেন। প্রতিদিনই অসংখ্য অভিযোগ আসছে। অভিযোগের যাচাই-বাছাই শেষে গুজব বা অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। র‌্যাবের সব ব্যাটালিয়নে সাইবার মনিটরিং সেল রয়েছে। গুজব ও উসকানি বন্ধে যথেষ্ঠ কারিগরি সক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে র‌্যাবের।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে ও পরে অপপ্রচারের অভিযোগে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে এবং তদন্ত করে সাইবার গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন নির্বাচনকেন্দ্রিক অপপ্রচারের পুরোভাগে আছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। প্রশাসনের নজর এড়াতে দেশে কনটেন্ট বা ভিডিও তৈরি করে বিদেশ থেকে আপলোড করছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, ওমান ও কাতার থেকে গুজব ছড়াচ্ছে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি। তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাসহ সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচারের চেষ্টা করছে।

সাইবার অপরাধ তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে বিদেশে থাকা শিবিরের সাবেক নেতাদের একটি গ্রুপ সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচারকারীদের অর্ধ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। তারা ১৫০টি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে। তারা ইচ্ছামতো ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে এবং সরকারবিরোধী প্যারোডি গান তৈরি করে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে প্রচার করছিল। গত ২৯ নভেম্বর গুজব ছড়ানোর অভিযোগে নেয়ামত উল্লাহ নামে সাবেক এক উপসচিবকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

এর আগে ২৮ নভেম্বর রাতে রাজধানীর মগবাজার ও মৌচাক থেকে শিবির নিয়ন্ত্রিত ‘সাইমন শিল্পী গোষ্ঠীর’ তিন সদস্যসহ আটজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-২। ২৫ নভেম্বর এনামুল হক মনি নামে দক্ষিণ কোরিয়ায় গবেষণারত এক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তিনি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাসহ ২১টি গণমাধ্যমের পোর্টাল নকল করে গুজব বা ভুয়া খবর ছড়াচ্ছিলেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশের বাইরে থেকে অপপ্রচারের জন্য পরিচালিত ১৫টি ইউটিউব চ্যানেল ও তিন শতাধিক ফেসবুক আইডি বন্ধ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বন্ধ করেছে শিবির নিয়ন্ত্রিত বিডি পলিটিকো, বাঁশের কেল্লাসহ ৪০টি নিউজ ডোমেইন। নির্বাচনের আগেও শতাধিক পোর্টাল বা নিউজ ডোমেইন বন্ধ করা হয়। সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইউনিটে গত এক বছরে ১ হাজার ৬৭০টি অভিযোগ এসেছে। দুই শতাধিক আইডি শনাক্ত করে তাদের অ্যাডমিনদের গ্রেফতার ও তদন্ত চালানো হচ্ছে।

গুজব রোধে প্রবাসীরাও নজরদারিতে : গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ছয়টি দেশে অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত ‘গুজব’ ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের দায়ে সৌদি আরব ছাড়াও কাতার, অস্ট্রেলিয়া, ওমান, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়ার কয়েকজন প্রবাসীকে শনাক্ত করা হয়েছে। দেশে এলেই তাদের গ্রেফতার করা হবে।

পিডিএসও/হেলাল