এবারও ঘুঁটি এরশাদ!

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৭, ০৭:৫৮

বদরুল আলম মজুমদার

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই এরশাদকে নিয়ে শুরু হয় এক ধরনের খেলা। নির্বাচনী মৌসুমে কখনো এরশাদ নিজে খেলেন, আবার কখনো এরশাদকেই খেলার পাত্রে পরিণত করে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। এজন্য নির্বাচন এলেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে এরশাদের কদর বেড়ে যায় কয়েক গুণ। চৌকস খেলোয়াড় এরশাদ সময় বুঝে দিক পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেন না।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর থেকেই সংসদীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিপূরক হয়ে ওঠেন তিনি। এরশাদ কখনো আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সিঁড়ি হয়েছেন, আবার কখনো বিএনপির। আগামী ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরশাদকে নিয়ে চিরাচরিত খেলার সেই গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে নির্বাচনী রাজনীতিতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রসিক নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নিজেদের জোটে পেতে দুই দলই করছে নানা হিসাব-নিকাশ। এমন হিসাব থেকে এরশাদকে খুশি করার জন্য যেকোনো দল তাদের প্রার্থীকে সরিয়ে নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলই রংপুরের মতো একটি সিটিকে ছেড়ে দিতে মোটামুটি প্রস্তুত থাকবে বলেই মনে হয়।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগতভাবে সরকারে থাকলেও রংপুরে প্রার্থী দিয়েছেন এরশাদ। নিজ এলাকায় এরশাদের ইমেজ অটুট আছে, এমনটা জানান দিতে রংপুর সিটিতে তার প্রমাণ দিতে চাইছে জাতীয় পার্টি। আবার সরকারি দলের নেতারা বলছেন, রংপুরে জাতীয় পার্টির সেই গৌরব আর নেই। আর তাই রংপুর সিটিতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগও। আবার বিএনপির অবস্থানও রংপুরে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়েও ভালো বলে দাবি করছে তাদের জোট। এমন অবস্থায় নির্বাচনে তিন দলের অংশগ্রহণে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীর ভাগ্যে কী ঘটে তা নিয়ে শঙ্কায় স্বয়ং এরশাদ।

সূত্র জানায়, নিজ দলের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে এরশাদ মূলত তাকিয়ে রয়েছেন সরকারি দলের দিকে। কিন্তু যতদূর জনা যায়, সরকারি দলের প্রায় ডজনখানেক প্রার্থী নির্বাচনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত বর্তমান মেয়র ঝন্টুকেই মনোনয়ন দেয় দল। তাই কোনোভাবেই রসিক নির্বাচনের মেয়র হাতছাড়া করবে না আওয়ামী লীগ। অপরদিকে জাতীয় পার্টির একটি অংশের নেতাদের আশা, ‘শেষ পর্যন্ত সরকার কিছু একটা করবে।’ তারা মনে করছেন, সরকার জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিক বা না দিক, মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে রংপুরে তাদের লাঙলের প্রার্থী অনায়াসে বিজয়ী হবেন।

অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রেখে চলেন এমন নেতারা মনে করেন, সামনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নাও আসতে পারে। তাই জাতীয় পার্টিকে যেকোনোভাবেই হোক বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে এরশাদকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমন পরামর্শে এরশাদের সায়ও পেয়েছেন সেই নেতারা। তারা মনে করেন, সরকারি দলের প্রার্থীকে সব দিক থেকে পরাজিত করতে হলে বিএনপির সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, রংপুরের নির্বাচন নিয়ে কী অঙ্ক কাজ করছে তা আমি এখনই বলতে পারব না। তবে এখানে আমাদের প্রার্থী যথেষ্ট শক্তিশালী। বড় দুই দলের প্রার্থী থাকলেও আমি মনে করি আমাদের প্রার্থী সহজেই বিজয়ী হবেন। সরকারি দলের সঙ্গে জোটপ্রার্থী নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়ে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। দলের কারো সঙ্গে কথা হয়েছে কি না আমার জানা নেই। তবে সরকারের প্রার্থীদের অবস্থা দেখে মনে হয় না তারা নির্বাচন থেকে সরবে। তবে বিএনপির সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে বিএনপি এখনো রংপুরে তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করেনি। তা ছাড়া এ অঞ্চলে এ দলটির তেমন সাংগঠনিক অবস্থা বা জনসমর্থন ততটা নেই। তাই রংপুরে বিএনপি জোটের প্রার্থী নির্বাচনে তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারবেন না। সূত্র জানায়, এমন বিষয় মাথায় রেখে রংপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করতে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী নাও রাখতে পারে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে দলটি ভেতরে ভেতরে এরশাদের মেয়রকে ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে জাতীয় পার্টিকে সরকার থেকে আলাদা করার প্রয়াস চালাতে পারে। বিএনপি নেতাদের ধারণা, এরশাদ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে না থাকলে কিছুতেই সরকার নির্বাচন করতে পারত না। তা ছাড়া আগামী নির্বাচনের আগে এরশাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হলে আওয়ামী লীগ একা হয়ে পড়বে। তাতে সরকারের পতন বা বিএনপির দাবি আদায় অনেক সহজ হবে। তাই রংপুর সিটিতে বিএনপির প্রার্থীকে নানা অজুহাতে শেষ পর্যন্ত দল সরিয়েও নিতে পারে। এতে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় পার্টির একটি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, রংপুরে বিএনপির প্রার্থী থাকবে। কাকে মনোনয়ন দেওয়া যায় এ নিয়ে দায়িত্বশীল নেতারা কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করতে এবং এরশাদকে আস্থায় নিতে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে থাকবে না বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়। কারণ রংপুরে আমরা জেতার জন্যই মাঠে থাকব। তবে রংপুর নির্বাচনে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। সেখানের সব কিছু এখনো বিএনপির বিপক্ষেই আছে বলে জেনেছি।

জাপা সূত্র আরো জানায়, সংসদের বাইরে থাকা জাতীয় পার্টির নেতারাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর না থাকার পক্ষে। এই অংশের নেতৃত্বে জি এম কাদেরকে দেখা গেলেও তিনি এমনটা মানতে নারাজ। তবে এরশাদের নির্দেশেই জি এম কাদের বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করছেন বলে শোনা যায়। তবে বিএনপি এরশাদকে কোনোভাবেই আস্থায় নিতে পারছে না। ২০১৪ সালে নির্বাচনের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত এরশাদ ঠিক থাকতে পারেননি। পরে সরকারি সুবিধার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন। তবে এরশাদের অবস্থান শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দলটির কেউই বলতে পারবেন না। কারণ এরশাদ নিজে কখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তবে দেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে এরশাদ শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। যে দলের অবস্থা ভালো সেই দিকেই থাকবে এরশাদের পাল। এর আগে প্রধান দুটি দলই জাতীয় পার্টিকে নিজেদের জোটে চাইবে।

পিডিএসও/হেলাল