খুলনা-২ আসন

খুলনায় লড়াই হবে সেয়ানে-সেয়ানে

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৭, ১১:২২

মোঃ শাহ আলম, খুলনা

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর কাছে মাত্র এক হাজার ৬৭০ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ আলহাজ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ওই নির্বাচনে বিএনপির সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছিলেন ৯০ হাজার ৯৫০ ভোট। আর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান পান ৮৯ হাজার ২৮০ ভোট। বেসরকারি ভোট গণনায় প্রথমবার আলহাজ মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে জয়ী ঘোষণা করা হলেও পুনঃ ভোট গণনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু সামান্য ব্যবধানে জয়লাভ করেন।

গেল নয় বছরে খুলনা সদর আসনের (খুলনা সদর-সোনাডাঙ্গা) রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেকখানি বদলেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি প্রত্যাখ্যান করলে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই খুলনা-২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি একই সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। দলীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান থাকায় বর্তমানে তার নেতৃত্বে চলছে মহানগর আওয়ামী লীগের বৃহৎ অংশ।

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাধারণ মানুষ থেকে প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত খোলামেলাভাবে মিশেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল, বিয়ে-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাড়া-মহল্লায় রয়েছে তার অবাধ পদচারণা। কখনো আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে, উন্নয়নের দাবিতে কখনো রাজপথে আবার কখনো বস্তির (নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থান) মধ্যে দাঁড়িয়ে হয়তো ক্যারম খেলায় মেতেছেন। এতে মাঠপর্যায়ে ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

বড় দুই দলের জয়-পরাজয়ের হিসাব

১৯৭৩ সালে এ আসন থেকে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ বারী। এরপর জাতীয় পার্টির সরকারের বিদায়ের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী সাবেক স্পিকার অ্যাডভোকেট রাজ্জাক আলী। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও পুনরায় নির্বাচিত হন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেবার তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম। পরে উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলী আজগর লবী। সে সময় দলে বেশ একটি শক্ত অবস্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

২০০৮ সালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মিজানুর রহমান মিজান এমপি নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন পর ফিরে পাওয়া এ আসন হাতছাড়া করতে চায় না আওয়ামী লীগ। আর ৪০ বছর ধরে নিজেদের দখলে থাকা আসনটি হারিয়ে বিএনপি প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটি পুনরুদ্ধারের।

তবে খুলনা-২ আসন বরাবরই বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই আসন থেকে ৯১ হাজার ৮১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে বিএনপি নেতা আলী আসগার লবী নির্বাচিত হয়। এর আগে ১৯৯৬ ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী এই আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে সর্বশেষ জামায়াতে ইসলামী আলাদাভাবে এই আসন থেকে নির্বাচন করেছিল। ওই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী শামসুর রহমান প্রায় ১০ হাজার ভোট পায়। এরপর থেকে বরাবর বিএনপির প্রার্থীকেই তারা দলীয়ভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে। ফলে এ আসনে ভোট ব্যাংক আরো বেড়েছে বিএনপির। তবে দুই দলেই প্রতিপক্ষ রয়েছে। খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম এবং নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলী আজগর লবী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে অ্যাডভোকেট সাইফুল নগরীর প্রত্যেকটি ওয়ার্ড, থানা এবং ইউনিটগুলোতে চষে বেড়াচ্ছেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সম্ভাবনা, নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে নিয়মিত হাজির হচ্ছেন গণমাধ্যমের সামনে। রাজপথে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন আন্দোলন। সর্বশেষ কেসিসির ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রাজপথে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনায় বিএনপির রাজনীতিতে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর রয়েছে একক আধিপত্য। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার কারণে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা) নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। সিনিয়র সিটিজেন ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তৃণমূলে মাঠের রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তার উত্থান। বর্তমানে খুলনায় বিএনপি রাজনীতিতে তার কথাই শেষ কথা বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা।

এদিকে আগামী সংসদ নির্বাচন এরই মধ্যে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে রাস্তার মোড়ে, চায়ের স্টলে, সামাজিক আড্ডায়। খুলনায় বিএনপি-জামায়াতের একসময়কার আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ায় আওয়ামী লীগও হয়ে পড়েছে ঘরমুখী। অভিযোগ রয়েছে, দলটির নেতাকর্মীরা রাজনীতির চেয়ে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঠিকাদারি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। অপরদিকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মামলার জাল ও সন্দেহ-অবিশ্বাসে তৃণমূলে বিএনপি কিছুটা দিশাহীন হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, খুলনা-২ আসনটি সদর আসন হওয়ায় উল্লেখযোগ্য ভোটাররা এখানকার উন্নয়ন ও সামাজিক-রাজনৈতিক দিক বিবেচনা করে ভোট দিয়ে থাকেন। আগামী নির্বাচনে আধুনিক রেলস্টেশন, খুলনা-মংলা রেললাইন, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ, আইটি ভিলেজ, অর্থনৈতিক জোন, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রাধান্য পাবে বলে তাদের অভিমত।

খুলনা-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, আগামী নির্বাচনে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় খুলনা আওয়ামী লীগ। তাই সরকারের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে আগেভাগেই নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকারদলীয় এ সংগঠন। তিনি বলেন, তৃণমূলের কমিটি সুসংহত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের দেওয়া হয়েছে নির্বাচন প্রস্তুতির দিক নির্দেশনা।

আর নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে কৌশলের পথেই হাঁটছে খুলনা বিএনপি। খুলনায় দলটির শীর্ষ নেতা ও খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি বিএনপির রয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে মানুষ আবারও বিএনপিকে নির্বাচিত করবে।

"পিডিএসও/তাজ