আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, দখল চাইছে বিএনপি

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৯:৩৪

আমতলী (বরগুনা) থেকে এম এ সাইদ খোকন

বরগুনা, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ (সংসদীয় আসন নং-১০৯) এবং পাথরঘাটা বামনাও বেতাগী নিয়ে বরগুনা-২ (সংসদীয় আসন নং-১১০) আসন গঠিত। ভৌগোলিকভাবে এলাকাটি দুর্গম। ২০০৮ সালে ওই জেলার তিনটি আসনকে পুনর্বিন্যাস করে দুই আসনে রূপান্তরিত করা হয়।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বরগুনা ১-এর নির্বাচনী এলাকা সরগরম হয়ে উঠেছে। তৎপর হয়ে উঠেছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতারা। আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দলটি চাইছে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে। অপরদিকে আসনটি দখল করতে চাইছে বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগের ভেতরে রয়েছে কোমল দ্বন্দ্ব, বিএনপিতে প্রকাশ্যে। জাতীয় পার্টি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, নির্বাচন সামনে রেখে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

বরগুনা এক আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের দৌড়ে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, সাবেক এমপি ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কবির, আমতলী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ জি এম দেলওয়ার হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আব্বাস হোসেন মন্টু, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ গোলাম সরোয়ার ফোরকান, আমতলী পৌরসভার মেয়র মো. মতিয়ার রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মশিউর রহমান শিহাব।

গত পৌরসভা নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগে শুরু হয়েছে নীরব কোন্দল। ওই সময় ভোটের দিনে কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজের ওপর গুলি করে পুলিশ। তাতে আহত হন প্রার্থীসহ বেশ কয়েকজন কর্মী। পরাজিত হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এমন বিপদের সময় জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশে পাননি তিনি। সেই থেকেই দলে চলছে কোন্দল।

বর্তমান সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু নৌকা প্রতীক নিয়ে বরগুনা-১ আসন থেকে চারবার নির্বাচিত হন। তিনি গত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ আমলে খাদ্য উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। বরগুনার জনগণকে একত্রিত করে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত করেছি। দল একাধিকবার মনোনয়ন দিয়েছে, চারবার বরগুনার জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছে। আমি বরগুনার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।

এ ছাড়া বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন ২০০১ সালে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই থেকে দীর্ঘ ১২ বছর দলের বাইরে থাকার পরে জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান। সে সময় তিনি দেশের মধ্যে সর্বাধিক ভোটে নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন বাতিল আইনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট করেন। দেলোয়ার হোসেন বলেন, মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করি। ভবিষ্যতেও বঙ্গবন্ধুর একজন সৈনিক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মী হিসেবে বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করে যাব। দল মনোনয়ন দিলে শেখ হাসিনাকে এ আসনটি উপহার দিতে পারব।

অপরদিকে, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলহাজ মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, এখন বরগুনার উন্নয়নের জন্য পরিবর্তন দরকার। দলের কাছে বিগত দিনও মনোনয়ন চেয়েছি, এবারও চাইব। আশা করি দল বিবেচনায় নেবে। এ ছাড়াও পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মাঠে নেমেছেন বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছি। নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে ছিলাম, আছি। জনগণের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয়েছি। আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার জন্য গত পৌর নির্বাচনে গুলি খেয়েছি। আশা করি দল মনোনয়ন দেবে।

অন্যদিকে, বরগুনার আওয়ামী লীগের ঘাঁটির দখল নিতে, বরগুনার দুটি আসনই উদ্ধার করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি। কিন্তু দলীয় কোন্দলের কারণে সুবিধা করতে পারছে না দলটি। জেলা সভাপতি ও সম্পাদক এক গ্রুপে থাকলেও দলের অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছে দ্বন্দ্ব। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মো. ফিরোজ উজ জামান মামুন মোল্লা মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। এ ছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি মতিয়ার রহমান তালুকদার, সাবেক এমপি আলহাজ অধ্যাপক মো. আবদুল মজিদ মল্লিক অ্যাডভোকেট, জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলাম ফারুক মোল্লা, সাবেক উপজেলা চেয়্যারম্যান ও কৃষকদলের আহ্বায়ক লে. কর্নেল (অব.) আবদুল খালেক, তালতলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফরহাদ হোসেন আক্কাস মৃধার নাম শোনা যায়।

গত উপজেলা নির্বাচনে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রেজবুল কবিরকে মনোনয়ন দিলে বর্তমান জেলা বিএনপির ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। এই থেকেই বিএনপির দলীয় কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়। জেলা সভাপতি ও সম্পাদক গ্রুপের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকলেও অন্য গ্রুপের নেতাকর্মীরা নীরব।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদার বলেন, ২০০১ সালে বরগুনা-৩ আসন থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। পরে শেখ হাসিনা সংসদীয় আসন ছেড়ে দেওয়ার পরে উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই।

বরগুনা জেলা বিএনপির সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম ফারুখ মোল্লা বলেন, বরগুনার বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছি। তবে কিছু লোক বিএনপিতে ঢুকে দলের ক্ষতি করছে। তারা এ পর্যন্ত কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে নামেনি। দলের কাছে বিগত দিনেও মনোনয়ন চেয়েছি। দল শরিক দলকে এ আসন ছেড়ে দিয়েছে। আশা করি আগামী নির্বাচনে এ আসন উদ্ধার করতে বিএনপির প্রার্থী দেবে।

এদিকে বরগুনায় জাতীয় পার্টির নেই কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম। জাতীয় পার্টির বরগুনা জেলা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য জাফরুল আহসান ফরহাদের মৃত্যুর পরে মাঠে নেই নেতাকর্মীরা। এরশাদের শাসনামলে দাপিয়ে বেড়াত জাতীয় পার্টি। এখন কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। অফিসও খুলছে না কেউ। নেতাকর্মীরাও তাদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তবে জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান মুনসুর মনোনায়ন পেতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল