একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

সীমানা নিয়ে ইসিতে অভিযোগের পাহাড়

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০৮:৫৭

গাজী শাহনেওয়াজ

পিরোজপুর-৩ আসনের পুনর্গঠন চেয়ে আবেদন করেছেন জাকির খান নামে স্থানীয় একজন ভোটার। ২০০৮ সালে পিরোজপুর-১ সদর (নাজিরপুর-নেছারাবাদ) এবং পিরোজপুর-২ আসনকে একত্র করে পিরোজপুর-৩ আসনটি গঠন করা হয়েছিল। এখন এটা পুনর্গঠন করে দুটি স্বতন্ত্র আসন (পিরোজপুর-১ ও পিরোজপুর-২) চান স্থানীয়রা। একইভাবে বরিশাল-৩ (হিজলা-মুলাদি) আসনেরও পুনর্গঠন চেয়ে আবেদন করেছেন স্থানীয় ভোটার মো. শরীয়তউল্লাহ। এজন্য তিনি নির্বাচন কমিশনে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছেন। কেরানীগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়ন, কামরাঙ্গীরচর ও সুলতানগঞ্জ এবং সাভারের তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে বর্তমান সংসদীয় আসন ঢাকা-২। এই আসন থেকে সাভার উপজেলাকে একটি স্বতন্ত্র আসন করে সীমানা পুনর্বিন্যাসের আবেদন করেছেন ছানোয়ার হোসেন চুন্নু নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা। এর আগে ২০০৮ সালে বর্তমান ঢাকা-২ আসনটি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছিল।

এছাড়া সাতক্ষীরা-৩ আসনটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে আবেদন করা হয়েছে। সীমানা পুনর্বিন্যাস চেয়েছেন বরিশাল-২, ফেনী-৩, বরিশাল-৪, বরিশাল-৩, ঢাকা-২, নেত্রকোনা (বারহাট্টা), ঢাকা-১ এবং চাঁদপুরের (মতলব) স্থানীয় বাসিন্দারাও।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে আসনের পুনর্বিন্যাস চেয়ে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী আসন থেকে কমপক্ষে শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে ইসিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে বরিশাল, নেত্রকোনা ও কুমিল্লা থেকে। এর মধ্যে কেবল বরিশালের হিজলা-মুলাদি আসন থেকে জমা পড়েছে প্রায় একডজন অভিযোগ। একই ধরনের অভিযোগ জমা পড়েছে কুমিল্লা-১ আসন থেকে। পিরোজপুর জেলার একটি আসন থেকে অভিযোগ এসেছে একাধিক। আসন পুনর্বিন্যাস চেয়ে পিছিয়ে নেই নেত্রকোনা জেলার স্থানীয়রাও।

ইসির সূত্র মতে, সংসদীয় ৩০০ আসনের বিপরীতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো আসন থেকে দু-একটি করে অভিযোগ আসছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। কমিশন মনে করে, সীমানা বিন্যাসের আগ পর্যন্ত এই অভিযোগের সংখ্যা আরো বাড়বে। এসব অভিযোগের বেশিরভাগই আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকে। ইসিতে নিবন্ধিত অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকেও আসন পুনর্বিন্যাস চেয়ে আবেদন করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ৯ জুলাই ইসি ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপে সীমানা পুনর্বিন্যাসের জন্য চলতি বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে জিআইএস পদ্ধতি অনুসরণ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে সীমানা বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। এর আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সীমানা সংক্রান্ত জমা পড়া অভিযোগগুলোর অঞ্চলভিত্তিক শুনানি হবে। পরে ডিসেম্বরে ৩০০ আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করবে ইসি।

ইসিতে জমা পড়া অভিযোগগুলো থেকে জানা গেছে, অধিকাংশ অভিযোগ ২০০৮ সালে ১/১১-এর সময়ের ড. শামসুল হুদা কমিশনের সময় জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমে (জিআইএস) করা সীমানার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ড. হুদা কমিশন ওই সীমানা নির্ধারণের সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের সুবিধা-অসুবিধা এবং আপত্তি আমলে নেয়নি। এসব অভিযোগকারী ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ফিরে যেতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।

অবশ্য সীমানা পুনর্বিন্যাসের এসব অভিযোগ বর্তমান কমিশন কতটা আমলে নেবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ইসির সূত্র মতে, এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিদায়ী কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশনের সময়ও অনেকগুলো আসন থেকে অভিযোগ জমা পড়েছিল; কিন্তু কোনোটিরই সুরাহা হয়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সম্পন্ন হয় ২০০৮ সালের সীমানা বিন্যাস ধরেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান কমিশন কোনো রকমে দু-একটি সীমানায় পরিবর্তন এনে দায় সারতে পারে। নির্বাচন কমিশনারও তেমনই আভাস দিয়েছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগ কেবল স্তূপাকারে জমা থাকবে, নাকি কার্যকর হবে, সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে সীমানা বিন্যাসের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত।

অবশ্য এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সীমানা পুনর্বিন্যাসের পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছে। এ ব্যাপারে বিদায়ী কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক বলেন, ‘২০০৮ সালের ১/১১-এর সময় করা সীমানা পুনর্বিন্যাসের কারণে মানুষের সুবিধার বদলে ভোগান্তি বেড়েছে। আমরা বিন্যাস করলে ২০০৮ সালের আগে পুরনো সীমানায় ফিরে যেতে কমিশনকে উদ্বুদ্ধ করতাম। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে। তাই বর্তমান কমিশনের উচিত হবে নবম জাতীয় সংসদের আগে পুনর্বণ্টিত হওয়া সীমানায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে আগের সীমানায় ফিরে যাওয়া। এই কাজটি আমাদের কমিশন করে যেতে পারেনি।’

কিন্তু এর বিরোধিতা করে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের আগের কমিশনের (শামসুল হুদা কমিশন) নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই সীমানা বিন্যাস (২০০৮ সালে) করেছি। যেহেতু অনেকদিন ধরে সীমানা বিন্যাস করা হয়নি, সেহেতু আমাদের কমিশন সব দিক বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতিতেই বিন্যাস করে। সব পক্ষের কথা শুনে এবং জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক অখ-তা বজায় রেখেই তখন সীমানার কাজটি করা হয়। ফলে আমাদের সময়ে করা সীমানার পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিতর্ক থাকতে পরে, তবে বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। সুতরাং বর্তমান কমিশন চাইলে ওই সীমানায়ই সামান্য কিছু পরিবর্তন এনে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে।’

সীমানা সংক্রান্ত জমা পড়া অভিযোগের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমানা পুনবির্ন্যাসের দাবিতে অভিযোগ নয়, দাবি জমা পড়ছে। অনেকে অভিযোগে পুরনো সীমানায় ফিরে যেতে চাইছেন। কিন্তু সেখানে আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, ‘সীমানা বিন্যাসের জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো এখনই কমিশনের আমলে নেওয়ার কথা নয়। কারণ, খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর তা প্রকাশ করলে তখন অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ থাকে। তবে এখনই করা অভিযোগগুলোকে তামাদি বলছি না। সেগুলো নথিভুক্ত করা হচ্ছে। পর্যালোচনা করছি।’

এই নির্বাচন কমিশনার এমনও বলেন, সীমানা বিন্যাস করার প্রয়োজন পড়বে বিদ্যমান সীমানা বিন্যাস আইন সংশোধন হয়ে সংসদে পাস হওয়ার পর। দেখা গেল, কমিশনের পাঠানো আইনটি সরকার পাস করল না, তখন সীমানা বিন্যাস হবে প্রতীকী হিসেবে। অর্থাৎ, গ্রহণযোগ্য এবং প্রয়োজনের তাগিদে, তাও স্বল্প পরিসরে।

অবশ্য সীমানা পুনর্বিন্যাসের ব্যাপারে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিপরীত অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি। ক্ষমতাসীনরা চাইছে বিদ্যমান সীমানায়ই আগামী সংসদ নির্বাচন করতে। আর বিএনপির দাবি, ২০০১ সালের সীমানা অনুযায়ী নির্বাচন করতে হবে।

ইসির তথ্যমতে, ২০০৮ সালে ড. শামসুল হুদার কমিশনের সময় সংসদীয় ৩০০ আসন নির্ধারণের পর ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়। পার্বত্য ৩টি জেলা বাদে ২৯৭টি আসনেই পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে ১৩৩টিতে পরিবর্তন আনা হয় বড় পরিসরে। এর ফলে ঢাকায় আসন বাড়ে ৮টি। আর সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল ও ফরিদপুরে আসন কমে একটি করে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরের পর শুরু হবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা।

পিডিএসও/হেলাল