কৌশলী এরশাদ সতর্কও!

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৭, ১০:২৩

বদরুল আলম মজুমদার

আগামী জাতীয় নির্বাচনে কী করবেন এবং জাতীয় পার্টিকে নিয়ে কোন দিকে যাবেন, তা এখনো স্পষ্ট করেননি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবেন, এককভাবে নির্বাচনে লড়বেন—এ জাতীয় কথা হরদম বললেও ‘ডিগবাজির রাজনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচিতি তার। কখন কী বলবেন আর করবেন, তা নিয়ে আন্দাজ করা তার পাশের লোকটিরও যেন অজানা। তবে, দরকষাকষির পর্যায়ে গিয়ে নিজের এবং দলকে সুবিধাজনক জায়গায় নিতে চাইবেন, এমনটা হলফ করেই বলা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতি নিয়ে অনেক কিছু বলছেন এরশাদ। ভারত থেকে ঘুরে এসে ফুরফুরে মেজাজ যেমন দেখিয়েছেন, আবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল বিষয়ে নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের দেওয়া রায়ে সরকারের সঙ্গে তিনিও হয়েছেন বেজার। তবে শেষ পর্যন্ত কী করেন, তার দলকে নিয়ে কোন জোটের সঙ্গে ভেড়েন তা এরশাদ নিজেও এখন বলতে পারবেন না। জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এ অবস্থানের কথা জানা যায়।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল বিষয়ক রায়ে আদালত নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বর্তমান শাসন-ব্যবস্থার বিষয়ে অনেক নেতিবাচক কথা বলেছেন। এ রায় নিয়ে সরকারী দল চরম বেকায়দায় পড়লেও এরশাদ রায় নিয়ে ব্যক্ত করেছেন সতর্ক প্রতিক্রিয়া। রায়ের পূর্ণ কপি প্রকাশ হওয়ার পর গত সোমবার ইউনিয়ন ব্যাংকের একটি শাখা উদ্বোধন করতে চট্টগ্রামে গিয়ে এরশাদ বলেন, ‘লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেছে। বাংলাদেশিদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। আমরা নিজেদের খুব দুর্ভাগ্যবান মনে করছি। রায়টা পড়ার পর মনে হয়েছে আমরা খুব দুর্ভাগ্যবান।’ নির্বাচন নিয়ে এরশাদ বলেন, ‘গতবারের মতো একটি নির্বাচন দেশের মানুষ চায় না। আশা করি এবারের নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে। নিরপেক্ষ হবে। তবে সেটার সবকিছু নির্ভর করবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপর। তিনি যদি আর্মি চান, সরকার দিতে বাধ্য। উনি যদি ডিসির পোস্টিং ?চান, সরকার ডিসির পোস্টিং দিতে বাধ্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অসীম ক্ষমতা। তিনি সেই ক্ষমতা খাটাবেন কি না এবং সত্যিকারভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবেন কি না; সেটা নির্ভর করছে তার ওপর।’ তবে তিনি বলেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা আছে। আশা করি তারা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পারবে।’

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এরশাদের এমন বক্তব্যের পর রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এরশাদের প্রতিক্রিয়া কৌশলী। তিনি সরকারের বিপক্ষে না বললেও প্রকারান্তে রায়ের বিষয়ে নিজের অপছন্দের কথাই বলেছেন। তবে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখে সব কূলই রক্ষা করছেন এরশাদ। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন বিষয়ে এরশাদের বক্তব্য দেখলে বোঝা যায়, উনি দুই কূলই রক্ষা করতে চান। সরকারের বেকায়দায় যেমন অতি ক্রন্দন ভাব দেখাতে পারছেন না। আবার সেনা মোতায়েন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিও পুরোই কৌশলী। তারা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পর এরশাদ দোটানায় পড়েছেন। কারণ কোনোভাবেই যদি বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় না যায় তাহলে রাজনৈতিকভাবে তার দল আবার ভাঙনের মুখে পড়বে। এখনো তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় কারাগারেও যেতে পারেন। এরশাদকে শেষ বয়সে জেলে যেতে হবে, এমনটা তিনি নিজে কখনো চান না। তাই চাইলেও এরশাদ তার রাজনৈতিক অবস্থানও এখনো পরিষ্কার করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী সিরাজ বলেন, ‘ওনার (এরশাদ) কথা আর কী বলব। ওনাকে দেখতে বা বুঝতে হলে দেশের মানুষের আরো অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে তার বর্তমান অবস্থান হলো দুই কূল রক্ষার রাজনীতি।’

এ বিষয়ে জাপার কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে, আমরা এককভাবে নির্বাচন করব। সারা দেশে তিন শ আসনে মনোনয়ন নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে জাপা সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘জাপা কোন জোটে যাবে, না যাবে; তা এখনই বলার সময় আসেনি। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি সবেমাত্র শুরু হলো। এখনো অনেক দেখার এবং বোঝার বাকি আছে। জোটের রাজনীতির শেষটা এখনই বলার সময় নয়।’ তৃতীয় জোটে অংশ নিতে চান কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি এখনো সঠিকভাবে কিছু বলা যায় না। মন্ত্রিসভা থেকে জাপা সদস্যরা পদত্যাগ করার পর জাপার রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে বলে মত দেন তিনি। তবে সবকিছু নির্ভর করছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের ওপর।’

জাতীয় পার্টির নেতাদের ধারণা, আগামী নির্বাচনে বিএনপিসহ সব বড় দল অংশ নেবে। তারা জানান, বিএনপি নির্বাচনে এলে জাপার কৌশল হবে একরকম। বিএনপি ভোট বর্জন করলে গতবারের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে ভোটে অংশ নেবে। নামসর্বস্ব ৫৮ দলকে নিয়ে গড়া ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ (ইউপিএ)-এর ব্যানারে ভোটে অংশ নেবে। সব বড় দল নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি, যার সঙ্গে সুবিধা হবে তার সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেবে এরশাদের দল।

দলটির নেতাদের অভিমত, ‘দ্বিদলীয় দ্বৈরথে’ টিকে থাকতে হলে জাপাকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট কিংবা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে যেতে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোন জোটে যাবেন এরশাদ, তা তিনি ছাড়া কেউই বলতে পারেন না।

পিডিএসও/হেলাল