ভোটে সব দলকেই চায় সরকার

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৭, ১১:২২

প্রতীক ইজাজ

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের পথেই হাঁটছে সরকার। তাই নির্বাচনী রাজনীতিতে খুবই সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। নিতে দেখা যাচ্ছে সবাইকে আস্থায় রাখার বিশেষ কৌশল। বিশেষ করে সংবিধানের মধ্যে থেকেই কিভাবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে নির্বাচনে আনা যায়, সেই লক্ষ্যে নানা রকম হিসাব-নিকাশও করছে ক্ষমতাসীন দলটি। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনসহ সরকারের ভাবমূর্তি বহন করে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সব দল-মতের আস্থা আনতেও বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে তারা।

এর পাশাপাশি এবারো ক্ষমতায় আসতে চায় আওয়ামী লীগ। সরকারের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে তাই নির্বাচনী রাজনীতিতে শরিক দলগুলোকে নিয়ে জোটবদ্ধ নানা রকম কৌশলও আঁটছে। ভোটারদের ওপর এবং নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন সুশীল সমাজসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে আস্থা অর্জনেও কাজ করে যাচ্ছে। ‘একাদশ নির্বাচন ৫ জানুয়ারির মতো হবে না, নির্বাচন কঠিন হবে’—প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার এমন নির্দেশকে আমলে নিয়ে তাই মাঠে সক্রিয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। ভোটযুদ্ধে জিততে দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মাঠে নেমে গেছেন।

সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে সরকারের সদিচ্ছার প্রতি আস্থা রাখতে দেখা যাচ্ছে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনী রোডম্যাপে সবাইকে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছে। যদিও সংলাপে সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে উঠে আসা কিছু প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, কিন্তু সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সেই বিতর্ক নিরসনে ইসির সদিচ্ছা সুষ্ঠু নির্বাচনের ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এমনকি বিএনপিও মনে করে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তাই মুখে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে তেমন নির্বাচনের পথেই হাঁটছে দল এবং মিত্ররা। তারা মরিয়া ক্ষমতায় ফিরে আসতে। এই দুটি জোটের বাইরে থাকা জাতীয় পার্টি (জাপা) সহ অন্যান্য নিবন্ধিত দলও বসে নেই। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী ডান-বামপন্থী অন্যান্য দল সমমনাদের নিয়ে পৃথক বলয় গড়তে তৎপর হয়ে উঠেছে। সরকারের প্রতি এক ধরনের আস্থা থেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে শোনা যাচ্ছে নানা রকম নির্বাচনী ফর্মুলা বা তত্ত্বের কথা।

এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো বাকি প্রায় ১৭ মাস। চূড়ান্ত বিচারে মনে হচ্ছে, বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি, নির্বাচন কমিশন কিছু করছে না—এসব কথা বলে দলটি মনে হয় কমিশন ও সরকারকে আপাতত চাপে রাখতে চাইছে। ফলে নির্বাচন যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে, তেমনটাই মনে হচ্ছে। তবে আসলে কী হবে, তা আরো কিছুদিন পর বোঝা যাবে। কারণ, এখনো নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক আস্থা ও সম্পর্কের পরিবেশ পুরোপুরি সৃষ্টি হয়নি।

এই বিশ্লেষকের পরামর্শ, ‘বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে বিএনপিসহ সব দলের প্রস্তাবগুলো মূল্যায়ন করা। এরপর এসব বিষয়ে কমিশনকে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। এছাড়া নির্বাচনের প্রায় ৬ মাস আগে কমিশনের উচিত সুস্পষ্ট নির্বাচনী নীতিমালা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করা। একইভাবে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দায়-দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দলের ওপরই বর্তায়। তবে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস মিলেছে। হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর ২৯ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সরকার যে সব দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চায়, সরকার এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কৌশল তেমনটাই আভাস দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতারাও সরকারের এমন ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, গত বছর অক্টোবরে অনুষ্ঠিত দলের ২১তম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের কথা জানিয়েছেন। পরে তিনি সাংগঠনিকভাবেও তেমন নির্দেশ দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী দলটি মূলত আগে থেকেই নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছে। নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চলছে। এমনকি দলের কার্যনির্বাহী সংসদ এবং সংসদীয় দলের বৈঠকে শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। এসব সভায় তিনি অভ্যন্তরীণ বিভেদ মিটিয়ে দলকে চাঙ্গা করার কথা বলেন। প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে জনগণের দোরগোড়ায় যাওয়ার পরামর্শ দেন। প্রার্থী মনোনয়নের জন্য তিনি একাধিক সংস্থার মাধ্যমে জরিপ চালানোর কথাও বলেছেন সংসদ সদস্যদের।

সূত্রগুলো আরো জানিয়েছে, নির্বাচনী তৎপরতার অংশ হিসেবে দলের তৃণমূলের বিভেদ মেটানো হচ্ছে। নির্বাচনী কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির কার্যালয়ের পাশে একটি আলাদা অফিসও নেওয়া হয়েছে। ওই অফিসে দলের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজও শুরু করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

দলীয় নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সরকার এবং দলের চলমান নির্বাচনী রাজনীতিও নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনের আগে আর কারো বিরাগভাজন হতে চান না। তাই এই মুহূর্তে সরকার বা আওয়ামী লীগ নানা রকম চাপের মুখে থাকলেও বেশ সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের দ্বন্দ্ব নিরসনে শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির বিধিমালা প্রণয়ন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বেশ বিব্রত। বিএনপিও বেশ তির্যকভাবেই সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছে। এরপরও সরকার বা আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ। এ ব্যাপারে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া পরে জানানো হবে।’ তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সতর্ক কৌশল প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘সব দল নির্বাচনে অংশ নিক, তা সরকার চায়। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আমরা সেভাবেই এগোচ্ছি।’

বিএনপি মুখে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি থাকলেও সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচন হবে এমনটি ধরে নিয়েই এগোচ্ছে টানা ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলটি। দলীয় সূত্র মতে, নির্বাচনী মাঠ প্রস্তুতের অংশ হিসেবে দ্বন্দ্ব-সংঘাত মিটিয়ে দলটি তার তৃণমূলকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা মহানগরসহ জেলা সংগঠনকে ঢেলে সাজাচ্ছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতারা সারাদেশে সফর শুরু করেছেন। দ্বন্দ্ব-কোন্দল মেটানো এবং প্রার্থী বাছাইয়ে জেলায় জেলায় করা হচ্ছে কর্মিসভা। সূত্রগুলো আরো বলছে, খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরে এখনো পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। সেখান থেকে দেশে ফিরে নির্বাচনী রূপরেখা প্রকাশ করা হবে। রূপরেখা ছাপার কাজ চলছে। এ ব্যাপারে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা একটি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। আমাদের ৩০০ আসনের বিপরীতে ৯০০ প্রার্থী প্রস্তুত আছেন। তবে সেটা নির্ভর করবে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর।’

একইভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিও মনে করে, নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে। এ ব্যাপারে পার্টির মহাসচিব ও জোটের মুখপাত্র এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। দেখতে দেখতে সময় শেষ হবে। তাই আমরা আগেভাগেই নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছি। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে।’

রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্বাচনী সংলাপ শুরু হয়েছে। সংলাপ শেষে উঠে আসা প্রস্তাব সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে বলে মত দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। কমিশন বারবার সবাইকে আস্থায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়ে আসছেন। বিশ্লেষকরাও ইসির এমন ইচ্ছাকে (সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) সংবিধানের মধ্যে থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষণ বলে জানিয়েছেন।

পিডিএসও/হেলাল