আস্থা রাখার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে ভয় কেন

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০৯:০৯

বিশেষ প্রতিনিধি

বর্তমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে ক্ষেত্রে সব দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে সরকারও। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে তফসিল ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন সরকার কী ধরনের কাজ করতে পারবে-সংবিধানে সে কথাও বলা আছে। সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও ওই কর্মপরিধি তুলে ধরে নির্বাচনে অংশ নিতে ও সরকারের প্রতি আস্থা আনতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকার সহায়ক সরকার হিসেবেই থাকছে। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তিনি শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবেন। এমনকি মেট্রোরেলের মতো প্রকল্প শেষ হয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রী তখন ইচ্ছে করলেও তা উদ্বোধন করতে পারবেন না। কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ফলে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ভোট হবে না বলে যে অভিযোগ তা অহেতুক। কারচুপি, ষড়যন্ত্র ও জালিয়াতি করে ক্ষমতায় আসার মনমানসিকতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেই। এ ধরনের কাজ তিনি করবেনও না।

ক্ষমতাসীনরা এমনও বলছেন, ক্ষমতাসীন সরকারের এ সময় নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোনো দায়িত্ব থাকবে না। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কিংবা সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ তখন ইসির অধীনে থাকবে। তাই সে সময় যে সরকার থাকবে সেই সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো ভূমিকা থাকবে না।

এমনকি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মূল দায়িত্ব যে সংস্থার, সেই ইসিও নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব নিতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা। তার মতে, জাতীয় নির্বাচনের সময় যেহেতু প্রশাসনিক সব ক্ষমতার অধিকারী ইসি, তাই প্রয়োজনে তারাই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করতে পারে। কারণ তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন সব প্রশাসনিক ক্ষমতার কর্তৃত্ব পায়। এমনকি নির্বাচন কমিশনপ্রধান এমন ঘোষণাও দিয়েছেন, নির্বাচনের সময় যে সরকারই থাকুক না কেন, ইসির দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে। বর্তমান ইসি তা করতে সক্ষম। তার পরও বর্তমান সরকারের অধীনে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে আগ্রহী নয় ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। দলের মতে, এ সরকারের অধীনে কিছুতেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। লন্ডনের উদ্দেশে দেশত্যাগের সময় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন, শেখ হাসিনাকে সরতেই হবে। এমনকি দলের পক্ষ থেকে সর্বশেষ গত রোববার ইসির রোডম্যাপ প্রকাশের দিনও বিএনপি নেতারা ইসির প্রতি তাদের অনাস্থা প্রকাশ করেছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ‘রোডম্যাপে’ একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলমান সংকটের সমাধান হবে না।

সরকার ও ইসির এত প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকার পরও এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে বিএনপির এত ভয় কেন-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, পরাজয়ের ভয়েই বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিতে নানা উছিলা খুঁজছে। কারণ জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। বিএনপির প্রতি ভোটারদের আস্থাও কমেছে। এমনকি নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর বাকি থাকলেও এখনো তারা দলই গুছিয়ে উঠতে পারেনি। দলের পক্ষ থেকে সহায়ক সরকারের যে দাবি তোলা হচ্ছে ও দাবি আদায়ে যে আন্দোলন কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে। আন্দোলন করার মতো সামর্থ্য বিএনপির নেই। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন রাখতে এবং দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এবার বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে তিন মাসে সরকারি কর্মকর্তা বিশেষ করে নির্বাচন তদারকি কাজে নিয়োজিত জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বদলি পদায়ন নির্বাচন কমিশনের ওপরই ন্যস্ত থাকে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না। সুতরাং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ভয় বা আশঙ্কা নেই। তিনি এমনও মনে করেন, বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে এবং তা এ সরকারের অধীনেই।

তবে বিএনপির ভয় বর্তমান সরকার যেকোনো উপায়ে আরেক দফা ক্ষমতায় যেতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য সরকার সব ধরনের ব্যবস্থাও করে রেখেছে। বিশেষ করে তাদের ভয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এমনকি বর্তমান ইসির ওপরও তাদের আস্থা নেই। কারণ প্রধান নির্বাচন কমিশনার সরকারের লোক। সরকার ক্ষমতায় থাকলে এই ইসিকে ব্যবহার করে নির্বাচনে নানা ধরনের অনিয়ম করবে। বিশেষ করে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিন্ড সরকার তাদের ইচ্ছেমতো তৈরি করবে। বিএনপি এমনও মনে করছে, বর্তমানে সরকারের সবখানেই দলীয় লোকজন। নির্বাচনের সময় এরাই দায়িত্বে থাকবে। সুতরাং তখন এসব লোকজন আওয়ামী লীগের পক্ষেই কাজ করবে। নির্বাচনী মাঠ সরকার নিজেদের অনুকূলে রাখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে।

এ ব্যাপারে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। কারণ নির্বাচনের এখনো দেড় বছর বাকি থাকলেও আগামী নির্বাচন কেমন হবে তার আলামত আমরা দেখছি। পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউপি নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। তেমনিভাবে জাতীয় নির্বাচনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কারচুপির সব ধরনের ব্যবস্থা তারা করছে। তাই এই সরকারের ওপর সুষ্ঠু নির্বাচনের ভরসা রাখা যায় না।’

এমন পরিপ্রেক্ষিত কতটুকু যুক্তিযুক্ত ও সমাধান কী জানতে গতকাল কথা হয় দেশের দুই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। এদের মধ্যে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, এটি স্বাভাবিক। যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের নিয়ে প্রতিপক্ষের ভয় থাকে। কারণ সরকারের সব বিভাগেই দলীয় লোকজন থাকে। ক্ষমতাসীনরা তাদের আস্থাশীল লোকজন দিয়েই সরকার সাজায়। নির্বাচন কমিশনেরও এত কিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে না। সে ভয় থেকেই কিন্তু একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল। এবারও বিএনপি অনুরূপভাবে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছে। তবে এটি রাজনৈতিক ইস্যু। রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। এ ব্যাপারে ইসির কিছু করার নেই। ইসি চলে তার আইন দিয়ে।

‘যেহেতু বর্তমানে সংবিধানে সহায়ক সরকার বলে কিছু নেই, তাই বর্তমান সরকারের অধীনেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে। তবে নির্বাচনে যেন সরকার কোনো ধরনের প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য ইসিকে শক্তিশালী হতে হবে, নিরপেক্ষ ও নির্ভীকভাবে কাজ করতে হবে। যদি সেটা পারে, তাহলে এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে সমস্যা নেই। সরকারকেও সহযোগিতা করতে হবে। জোরজবরদস্তি করে, বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জয় পাওয়ার বাসনা দূর করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের উচিত হবে এ ব্যাপারে ইসিকে সহযোগিতা করা। তাহলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। আর বিএনপিকেও সেই আস্থা নিয়েই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে’-মন্তব্য করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ছহুল হোসাইন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক কাজী সিরাজ বলেন, বিএনপির ভয়ের কারণ হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের অধীনে এ দেশে নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। নির্বাচনকালে ক্ষমতাসীন দলের প্রশাসনের ওপর কর্তৃত্ব থাকে। তবে বিএনপি যে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার বলছে, সেই সরকার শেখ হাসিনার অধীনে হতে পারে না, বিষয়টা এমন নয়। বিএনপির উচিত হবে সেভাবে সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেওয়া, যেন আওয়ামী লীগ তা বাস্তবায়ন করতে পারে। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকার আর বিএনপির সহায়ক সরকারের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকবে বলে মনে হয় না।

এই বিশ্লেষক আরো বলেন, আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধানে নেই, এমন কোনো সরকার হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা তো সংবিধানে ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে এই সরকার ব্যবস্থা ছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ-দুটি দলকেই অহংবোধ বাদ দিতে হবে। আওয়ামী লীগ সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে আর বিএনপি তাতে অংশ না নিলে তা সুষ্ঠু হবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে এত সহজে পার পেয়ে যাবে বলে মনে হয় না। দুই দলকেই নমনীয় হতে হবে। নির্বাচনে ‘নেওয়া’ ও ‘যাওয়ার’ ব্যাপার রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড় দিতে হবে। আগামী নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার মতো ঝুঁকি বিএনপি নেবে বলে মনে হয় না।

পিডিএসও/হেলাল​