প্রথমবার সংশোধন হচ্ছে সীমানা বিন্যাস আইন

বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা পাচ্ছে ইসি

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৭, ১২:০২

গাজী শাহনেওয়াজ

প্রথমবারের মতো ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস আইনে সংশোধনী এনে বিদ্যমান আইনটিকে যুগোপযোগী করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সীমানাবিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি। স্বাধীনতার পর গত ৪০ বছর আগে সামরিক ফরমান জারি করে আইনটিকে কার্যকর করা হয়েছিল। সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা আইনটির পাশাপাশি বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা ইসির কাছে থাকবে।

একই সঙ্গে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রণীত সীমানাবিন্যাস করার আগে জেলাওয়ারি আসন নির্দিষ্ট করা হলে পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করা হবে। অপরদিকে, একটি সংসদীয় আসন থেকে অন্যটির ভোটার ব্যবধান কত (তিন লাখ, নাকি সাড়ে তিন লাখ) থাকবে, সেই ধরনের সুপারিশ থাকলে পরামর্শক ছাড়াই ইসির তত্ত্বাবধানে কাজটি শেষ হবে। এছাড়া সংসদীয় আসন যে কর্মপদ্ধতির আলোকেই করা হোক না কেন, প্রস্তাবিত আইনে ভোটার সংখ্যানুপাত এবং সংসদীয় এলাকার আয়তনের ক্ষেত্রেও বৈষম্য কম রাখা হবে এ ধরনের বিধি-বিধান অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ থাকবে কমিটির।

গত ৯ জুলাই চূড়ান্ত রোডম্যাপ অনুমোদন করার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সীমানাবিন্যাস কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম, নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম এবং যুগ্ম সচিব (আইন) সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সীমানাবিন্যাস আইনটি সংশোধনে সবাই একমত পোষণ করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে এই কমিটির সমন্বয়ক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বহু আগেই সীমানাবিন্যাস আইনটি পরিবর্তন করার কথা ছিল। কারণ, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ার মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি করে প্রণীত আইনগুলো বাতিল হয়ে যায়। মান্ধাতার আমলে, অর্থাৎ ৪০ বছর আগে যে ধ্যান-ধারণা থেকে আইনটি প্রণীত হয়েছিল, পট-পরিবর্তনে অনেক বদলেছে। তাই ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে আইনটি যুগোপযোগী করে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। তবে সবকিছুর মূলে সরকার। কমিশন যে আঙ্গিকে আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব করবে, তা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের পর সংসদে পাস করতে হবে। নির্বাচন কমিশনার বলেন, সীমানা আইন গঠন নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে। সেখানে আইনটি সংশোধনের পাশাপাশি বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তীকালে কোনো সংযোজন-বিয়োজন প্রয়োজন হলে বিধিতে সংস্কার করা যায়। এছাড়া জনসংখ্যার সঙ্গে প্রশাসনিক অখ-তার বিধান রয়েছে। তবে ভোটারদের সংখ্যানুপাত এবং আয়তনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে সামরিক ফরমান জারির মাধ্যমে সীমানা আইনের অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সংবিধানের ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি আদমশুমারির পর পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় আইনের সীমানাবিন্যাসের কথা বলা আছে। বিদ্যমান আইনে জনসংখ্যা, প্রশাসনিক অখ-তা এবং একটি আসনের সঙ্গে আরেকটি আসনের যোগাযোগব্যবস্থা সমুন্নত রেখে আসনবিন্যাসের বিধান যুক্ত রয়েছে।

কিন্তু ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে, সংসদীয় আসন কিংবা সেই অনুপাতে ভোটার সংখ্যা বাড়ছে না। ফলে কোনো কোনো জেলায় জনসংখ্যা বেশির কারণে আসন বাড়ছে, তদ্রপ কোনো কোনো জেলায় কমছে আসন। কমিশনের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্যমতে, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে করা সীমানাবিন্যাসে সবচেয়ে বেশি সংসদীয় আসনে পরিবর্তন আনা হয়। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৩৩টিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এতে ঢাকায় ৮টি আসন বাড়ে, আর গ্রামাঞ্চলে আসন কমে। তবে এটিএম শামসুল হুদা কমিশনের পুনর্বিন্যাস করা আসন পুনর্বণ্টনে আরো জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হবে- এমন আশঙ্কা থেকে বিদায়ী কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন আসনবিন্যাস থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখে। এটা ছাড়াই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বে এসে খান মো নুরুল হুদার কমিশন সংসদীয় আসনবিন্যাসের আগে আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সীমানা সংক্রান্ত কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানে সীমানা গঠন পদ্ধতির মধ্যে ভোটার সংখ্যা এবং এলাকার আয়তনকে আমলে নিতে চায় কমিটি। সবকিছুর মূলে রয়েছে সংসদীয় আসনের মধ্যে ভারসাম্য অক্ষুণœ রাখা। একই সঙ্গে জেলাওয়ারি সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে এ সংক্রান্ত কমিটি। আর প্রণীত আইনটি ইংরেজির বদলে বাংলায় রূপান্তর করা হচ্ছে। কমিশনের বক্তব্য, ‘দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ লোক অক্ষরজ্ঞানহীন। যুক্তিযুক্তভাবে দেশের বেশিরভাগ লোক ইংরেজি ভাষা বুঝতে পারে না। ইংরেজি ভাষায় লেখা নির্বাচনসংক্রান্ত আইন এবং আইনের করণীয় বিষয়গুলো সাধারণ ভোটারদের কাছে একেবারেই অস্পষ্ট থেকে যায় এবং তাতে আইনের সঠিক প্রয়োগ করা যায় না।’

এ ব্যাপারে কমিশনের আরো বক্তব্য, ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পর এবং স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও ওই আইন দুটি (আরপিও এবং সীমানাবিন্যাস আইন) ইংরেজিতে লিপিবদ্ধ রয়ে গেছে। আইন দুটি সর্বজন বোধগম্য করার প্রয়োজনে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা যেতে পারে।

কমিশন এই লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালের সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিয়ে সুধীসমাজ, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করবে, যা আগামী ৩১ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে।

সীমানাবিন্যাসে কমিশনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একজন কর্মকর্তা জানান, জনপ্রতিনিধি সবার। একজন জনপ্রতিনিধি কেবল ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ নন।

তিনি জানান, এই কারণে পৃথিবীর সব দেশে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। অতএব নির্বাচন কমিশন যদি এখন আইন পরিবর্তন করে এটা করতে চায়, তাহলে তারা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।

তিনি আরো জানান, যে সমস্যার কারণে কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার সমাধান আছে। বড় শহরগুলোর আসনসংখ্যা নিদিষ্ট করে দিতে হবে। জনসংখ্যা বাড়ুক, ওই শহরে আসন বাড়ানো যাবে না। তবে পঞ্চম সংশোধনীর রায় বাস্তবায়ন করার জন্য আইন সংশোধনে অনড় কমিশন।

পিডিএসও/হেলাল