শুরুতেই ভাঙছে এরশাদের জোট

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ মে ২০১৭, ১৫:৫৬

বদরুল আলম মজুমদার

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ৫ মে ৫৮ দল নিয়ে গঠন করেছেন দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক জোট। এই ঢাউস জোট গঠনের দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও রাজনীতিতে তার কোনো প্রভাবই পড়েনি। দেশের কোথাও এই ঢাউস জোট নিয়ে কোনো আলোচনা নাই। নামসর্বস্ব ৫৮টি রাজনৈতিক দল নিয়ে জোট গঠনের আগে বেশ হাঁকডাক শোনা গেলেও, জোট গঠনের পর কার্যত আগের মতোই। তা ছাড়া জোট গঠনের পর সরকার থেকে বেরিয়ে আসার কথা বললেও দলের মন্ত্রী-এমপিরা ‘থোড়াই কেয়ার’ করছেন তার কথায়। এ অবস্থায় এরশাদের নতুন জোট তার দলের মধ্যে আরেক দফা হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। এর ওপর সরকার থেকে বেরিয়ে আসার প্রশ্নে দলটিতে ফের ভাঙন ধরতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

মাঝেমধ্যেই এরশাদ একই কথার পুনরাবৃত্তি করে চলেন, ‘জাতীয় পার্টি কারো ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হবে না। বৃহত্তর জোট গঠনের মাধ্যমে আগামীতে ক্ষমতায় যাবে জাতীয় পার্টি। মানুষ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকার থেকে বেরিয়ে এসে অচিরেই সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে জাতীয় পার্টি। দুই নেত্রীর পর দেশের মানুষের ভরসা এরশাদ এবং জাতীয় পার্র্টি।’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এ জাতীয় নানা কথা রাজনীতিতে মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিলেও মানুষ একে সিরিয়াসলি নিচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকে।

এরশাদের জোটে নামসর্বস্ব দলের সংখ্যা দেখে সমালোচকরা বলছেন, এরশাদ মূলত সরকারের ইশারায় পথ হাঁটছেন। বিএনপি নির্বাচনে না এলে এরশাদের এই জোটকে কাজে লাগাতে পারে সরকার। এ জোট দিয়েই গড়া হতে পারে আগামী সংসদের বিরোধী দল। ১৯৮৮ সালে এরশাদের শাসনামলে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নির্বাচন বর্জনের মুখে জাসদের আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল ৭২ দলীয় সম্মিলিত বিরোধী দল। সেই নির্বাচনে একাধিক আসনে নির্বাচিত আ স ম আবদুর রব সংসদে বিরোধী দলের নেতাও নির্বাচিত হন। তাই এখন আ স ম রবের তৎকালীন ভূমিকার সঙ্গে জাতীয় পার্টির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী সিরাজ বলেন, ‘এরশাদের বিশাল আকারের নতুন জোট রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ভবিষ্যতে ফেলবে এমনটাও আশা করা যায় না। তবে নামসর্বস্ব দল নিয়ে এ জোট মূলত হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে। তার এসব কর্মকা-কে কেউ ভালো চোখে দেখে না। তা ছাড়া মানুষের কাছে এরশাদের গ্রহণযোগ্যতা যেমন নেই, তেমনি তার গড়া ৫৮ দলীয় জোটেরও কোনো আলোচনা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘শোনা গেছে এ জোটের অধিকাংশ দলই নাকি এরশাদ নিজ হাতে গড়ে দিয়েছেন শুধু দলের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। যেখানে নিবন্ধন আছে মাত্র একটি দলের। সেই জোট নিয়ে কথা বলার মতো তেমন কিছুই নেই। এরশাদ নিজে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসবেন বলে ঘোষণা দিলেও তার মন্ত্রীরা সেটা শুনবেন কিনা-তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ।’ অনেকে বলছেন, সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে কৌশলগত চাপে রাখতেই মূলত এই জোট গঠন। সরকারের ইঙ্গিতেই বিএনপি ভোটব্যাংকে হামলা চালাতেই নামসর্বস্ব ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে এই জোট গঠন করা হয়েছে। এটা হালে পানি পাবে না। একটি সূত্র জানায়, গড়ে ওঠতে না ওঠতেই ভাঙনের শিকার হতে যাচ্ছে এরশাদের নেতৃত্বাধীন ৫৮ দলীয় জোটের। সূত্রটি আরো জানায়, মাসখানেকের মধ্যেই অন্তত ১০টি দল জোট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রধান এ প্রতিবেদককে জানান, ‘বাংলাদেশে ছোটখাটো অনেক পার্টি রয়েছে, যারা মূলত এক ব্যক্তি এক পার্টি নীতিতে চলছে। এ রকম কয়েক হাজার অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের কিছুসংখ্যক এরশাদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে। দলের নাম অন্তত একবার হলেও মিডিয়ায় উচ্চারিত হবে, এতটুকুই এসব দলের নেতার আশা। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্যটি সফল হয়েছে, সুতরাং এখন আর জোটে থাকার কোনো মানে নেই। উপরন্তু সংবাদ সম্মেলন করে বের হওয়ার ঘোষণা দিলে মিডিয়ায় আরেকবার দলগুলোর নাম চলে আসবে, এতটুকুই বা কম কিসের।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট গঠনের চেষ্টায় অন্যরাও বসে নেই। নির্বাচন এলে অনিবন্ধিত এসব দলের কদর বেড়ে যায়। এ সময় প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে জোট গঠনের।’ বাংলাদেশ আম আদমি পার্টির চেয়ারম্যান হাজি মো. নাসির উদ্দিন বলেন, জোট থেকে শিগগির ১০-১২টি দল বেড়িয়ে যাবে। এই নিয়ে ভেতরে নানা রকম গুঞ্জন চলছে। এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘জোটের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল। তবে অনেক দল নিয়ে গঠিত জোটের সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একটা জোটে অনেক দল থাকতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়। বিএনপি জোটেও তো অনেক দল আছে যারা নামসর্বস্ব। যাদের ঠিকানা পর্যন্ত নেই।’

প্রসঙ্গত, গত ৭ মে জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ জাতীয় প্রেস ক্লাবে দুটি দল ও দুটি পৃথক জোটের সমন্বয়ে ইউএনএর ঘোষণা দেন। যাতে নিবন্ধিত দল দুটির মধ্যে রয়েছে জাপা ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। এর বাইরে থাকা দুটি জোট ‘জাতীয় ইসলামী মহাজোট’ ও ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)’। জাতীয় ইসলামী মহাজোটে ৩৪ এবং ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোটের (বিএনএ)’ ২২টি দল মিলে এই দুটি জোটে দলের সংখ্যা ৫৬। এর সঙ্গে জাপা ও ইসলামী ফ্রন্ট মিলে এরশাদের নেতৃত্বাধীন নতুন জোটে দলের সংখ্যা ৫৮টি।

পিডিএসও/হেলাল