জেলহত্যা দিবস: ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড

প্রকাশ | ০৩ নভেম্বর ২০১৬, ০৮:৪৪ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৬, ০৮:৫৪

প্রতীক ইজাজ

ইতিহাসের সেই কলঙ্কময় ৩ নভেম্বর আজ। রক্তক্ষরা জেলহত্যা দিবস। ৪০ বছর আগে ১৯৭৫ সালের এই দিন মধ্যরাতে নিমর্ম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরিচালক, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় চার নেতাকে। তারা হলেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন জঘন্য, নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এই চার বীর সেনানীকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে তাদের সরকারে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে প্রথমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সেই কারাগারেই অন্তরীণ থাকা অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাদের। সেই থেকে দিনটি জেলহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে জাতির জনককে তার ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধকালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের মুজিবনগর সরকারের সমধিক পরিচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কোটি কোটি বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ঘাতকরা বাঙালিকে পিছিয়ে দিয়েছিল প্রগতি-সমৃদ্ধির অগ্র মিছিল থেকে। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে শুধু এ দেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল গোটা বিশ্ব। কিন্তু আজ অবধি সে হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ শেষ হয়নি। শহীদ পরিবারের সন্তানরা পথ চেয়ে আছেন বিচারের আশায়।

জাতি আজ এই চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাবে। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করবে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত এই কালো অধ্যায়টিকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল সংগঠনের উদ্যোগে সারাদেশে পালিত হচ্ছে শোকাবহ এই দিবস। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা শহীদ জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

যেভাবে হত্যা করা হয় : দেশের বিশিষ্ট লেখক গোলাম মুরশিদ তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, কর্নেল ফারুক এবং কর্নেল রশিদকে নিয়েই জেলহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ডও ছিলেন এ তিনজন। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় মুসলেমউদ্দীন। এর আগে এই ঘাতকই ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় অংশ নিয়েছিল। আর নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ। খালেদ মোশাররফ (শাফায়াত জামিলের সহায়তায়) ২ নভেম্বর ভোর রাতে অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খুব ভোরে অভ্যুত্থান ঘটান। এই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল রাত দুটায়। এটা টের পেয়েই ফারুক আর রশিদ একটি ঘাতক দল পাঠায় ঢাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর নেতৃত্ব দেয় মুসলেমউদ্দীন। এই ঘাতক দলের একমাত্র মিশন ছিল চার নেতাকে হত্যা করা। সেখানে ঢোকার পর জেল কর্তৃপক্ষ তাদের বাধা দেয়। পরে ঘাতক বাহিনী তাদের নির্দেশদাতাদের সঙ্গে বঙ্গভবনে টেলিফোনে যোগাযোগ করে। এরপর তাদের ঢুকতে দেওয়ার নির্দেশ আসে সর্বোচ্চ মহল থেকে। জেলের এক কক্ষে থাকতেন তাজউদ্দীন আর নজরুল ইসলাম। পাশের কক্ষে মনসুর আলী আর কামরুজ্জামান। ঘাতকরা তাদের সবাইকে তাজউদ্দীনের কক্ষে একত্রিত করেন। তারপর সেখানেই তাদের গুলি করে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তাজউদ্দীন কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন। কিন্তু অন্য তিনজন মারা যান প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। রাত চারটায় টেলিফোনে তৎকালীন জিআইজি মোশতাককে এই হত্যাকা-ের কথা অবহিত করেন। ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক শাফায়াত জামিল জাতীয় চার নেতাকে হত্যার খবর পান পরের দিন সকাল বেলায়।

জেলহত্যার বিচার : আলোচিত এ হত্যা মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড ও ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- দেন আদালত। এদের মধ্যে চারজনের ফাঁসি হয় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায়। অবশিষ্ট মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত তিন ও যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত আট আসামি বর্তমানে বিদেশে পলাতক রয়েছেন। ফলে ৪০ বছরেও তাদের বিচারের জন্য সোপর্দ করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইন্টারপোলকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি শিগগিরই পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করে দেশে এনে বিচারের জন্য সোপর্দ করতে পারব।

জানা গেছে, জেলহত্যার পরদিন তৎকালীন উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার জেলহত্যা মামলার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করে। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামির মধ্যে ১৫ সাবেক সেনা কর্মকর্তার শাস্তি এবং অপর ৫ জনকে খালাস দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক তিন আসামির মৃত্যুদ- এবং অপর ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তরা হলেন দফাদার মারফত আলী শাহ, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান ও এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা। যাবজ্জীবিন কারাদ-প্রাপ্তরা হলেন কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব) এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, লে. কর্নেল (অব) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আহম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মো. কিসমত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার। আর খালাসপ্রাপ্তরা হলেন বিএনপি নেতা মরহুম কে এম ওবায়দুর রহমান, জাতীয় পার্টি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, নুরুর ইসলাম মঞ্জুর এবং মেজর (অব.) খায়রুজ্জামান।

এরপর ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে কেবল রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদ- বহাল রেখে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা এবং যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত অপর চার আসামি লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব) শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে মামলা থেকে খালাস দেয়া হয়। পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় এই খালাসপ্রাপ্ত চার আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সে বছর নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ওই চার আসামির চারটি আপীল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন। পরে ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর সরকারপক্ষ জেলহত্যা মামলার আপিল বিষয়ে সারসংক্ষেপ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জমা দিলে পুনর্বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত বছরের ৩০ এপ্রিল আপীল বিভাগের চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত রায়ে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখা হয়।

চার নেতার পরিবার : সৈয়দ নজরুল ইসলামের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের টানা দু’দফায় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। অন্য চার সন্তানের মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম ও সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম ব্যবসা করছেন। দুই মেয়ের কেউ-ই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীন মারা গেছেন ২০১৪ সালে। একমাত্র ছেলে তানজীম আহমদ সোহেল তাজ গাজীপুর থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্যপদ এবং মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। পরে ওই আসনে তার বড় বোন সিমিন হোসেন রিমি উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দশম জাতীয় সংসদেও রিমি নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি। অপর দুই মেয়ে শারমিন আহমদ এবং মাহজাবিন আহমদ রাজনীতিতে যুক্ত হননি। এম মনসুর আলীর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তার দুই ছেলে ও এক নাতি রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। এম মনসুর আলীর তিন ছেলের মধ্যে মোহাম্মদ নাসিম এবং ড. মোহাম্মদ সেলিম এবং নাতি তানভীর শাকিল জয় সংসদ সদস্য হয়েছেন। ড. মোহাম্মদ সেলিম ২০১৪ সালে মারা গেছেন। মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য। তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অপর ছেলে ড. মোহাম্মদ সেলিম সিরাজগঞ্জ কাজীপুর আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ এইচ এম কামরুজ্জামানের দুই ছেলে ও চার মেয়ে। এর মধ্যে চতুর্থ সন্তান খায়রুজ্জামান লিটন ১৯৮৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত টানা ২৬ বছর রাজশাহী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

কর্মসূচি : আওয়ামী লীগ জাতীয় চার নেতা ও ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, কালোব্যাজ ধারণ, দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। বিকাল ৩টায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠেয় জনসভায় প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।