উত্তরা আওয়ামী লীগে ত্রাণের রাজনীতি

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২০, ১০:৩০

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর উত্তরায় নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষের হাহাকার আগের মতো না থাকলেও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। লকডাউন পরিস্থিতি না থাকলেও উত্তরাজুড়ে এখনও গরিব মানুষের না খেয়ে থাকার ঘটনা ঘটছে। অথচ লকডাউন সময়ে ত্রাণ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মাঠে থাকতে দেখা গেলেও এখন আর দেখা মিলছে না তাদের। অপরদিকে আওয়ামী লীগ করেন না বা অতীতেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না, এমন দু-তিনজনকেও ত্রাণের বহর নিয়ে শোডাইন করতে দেখা গেছে। 

লকডাউন সময়ে অনেকের ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখলেও কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ বহর বা শোডাউনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে। কারণ হিসাবে জানা গেছে, অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেখা না গেলেও সামান্য কিছু ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতেই মাঠে নামেন তারা। আবার স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রচারণার আড়ালে মূলত তারা ব্যক্তি প্রচারকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এসব প্রচার শোডাউনে গরিবের কতটা উপকার হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্নও আছে।

তবে গরিব মানুষের উপকার না হলেও সেই সব নেতারা নিজেদের প্রচারটা ঠিকই করে নিয়েছেন। অনেকে বলছেন, এমনিতে মাঠে নামার উপলক্ষ না থাকলেও ত্রাণের নামে শোডাউন আর বহর দিয়ে মূলত তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই করে গেছেন। 

আবার বিপরিত চিত্রও আছে, যারা দাীর্ঘদিন ধরে উত্তরায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত আছেন, তাছাড়া বিভিন্ন সামাজিক কাজ কর্মেও তাদের সামনে থাকতে দেখা যায়, তারা অনেকটা দায়বদ্ধতা থেকে সাধারণ মানুষের পাশে আগেও ছিলেন এখনও আছেন। তারা ত্রাণ নিয়ে অভিনয় বা বহর অথবা শোডাইনের কথা চিন্তা করে সামনে আসেননি। লকডাউন সময়ে উত্তরার কিছু ঐতিহ্যবাহী পরিবার বরাবরের মতোই সাহায্যে সহযোগিতা দিয়ে সব সময় মানুষের পাশে থাকছেন। তারা এবারও করোনা মহামারির সময় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মাঠে ছিলেন। জানা যায়, এসব নেতারা সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এখনও গরিবের পাশে আছেন। 

এলাকার স্থানীয় কাউন্সিলরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি ওয়ার্ডে তারা কম বেশি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার প্যাকেট ত্রাণ বিতরণ করেছেন, তাদের ত্রাণের হিসাব করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজারের উপরে। কাউন্সিলরদের বাইরে অন্য যারা ত্রাণের হাজার হাজার প্যাকেটের কথা বলছেন, সেগুলো আসলে গল্প না সত্যিকারের সহায়তা, এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত সকলের প্রচার হওয়া প্যাকেটের হিসাবগুলো একত্র করলে ত্রাণ প্যাকেটের পরিমাণ তিন লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যাবে। প্রতি প্যাকেট টাকার অংকে ৫শ টাকা করে হিসাব করলে পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি। প্রতি ওয়ার্ডে ৩ থেকে ৪ হাজার উপকার ভোগী থাকলে উত্তরা, উত্তর খান, তুরাগ ও দক্ষিণখানে মোট উপকার ভোগীর দাঁড়ায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি। সেই হিসেবে প্রতি পরিবার প্রায় ৩ হাজার টাকার ত্রাণ পাওয়ার কথা। 

মোটামোটি ধারণার উপর এমন একটি হিসাবের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উত্তরা আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা প্রতিবেদককে বলেন, এগুলো সব গালগল্প। সত্যিকারের ত্রাণ কতটুকু হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে একটি মহল্লা হিসেব করলে। অধিক সংখ্যক গরিব লোকের বসবাস, এমন একটি পাড়ার হিসেব দিয়ে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ তিন শতাধিকের মতো পরিবার হবে। যারা এক বা দুবার বা সর্বোচ্চ তিন বার পেতে পারে। আবার কাউন্সিলরদের অনেকে পিক অ্যান্ড ছুস পদ্ধতিতে ত্রাণ দিয়েছেন। 

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, উত্তরার একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাত-দিন সমানে ত্রাণ দেয় অথচ তার এলাকায় ত্রাণ খাওয়ার লোক নাই। এগুলো ত্রাণ না ফটোবাজি, তাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, অনেক বড় বড় শিল্পপতি প্রতি ওয়ার্ডে ২/৩ শত প্যাকেট ত্রাণ দিয়ে যে প্রচারণা করেছেন, তাতে মনে হয়েছে, ত্রাণের বহর বইছে উত্তরায়। তারা আসলে ব্যবসায়ী মানুষ, অল্প কাজের বেশি প্রচার করার অভ্যাস তাদের। দলকে দেখাবে, মানুষকে দেখাবে এটাই ছিল অনেকের উদ্দেশ্য। আওয়ামী লীগ আর আগের আওয়ামী লীগ নাই। এখানে এখন আগের কর্মের হিসাব হয় না। নগদ দিয়েই বিচার করার ফন্দি আঁটেন অনেক সিনিয়র। এমনটা চলতে থাকলে দল বিপদে পড়বে। লাভ হবে নব্যদের, যারা সহজেই সাইড পাল্টাতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল