গণ্ডির বাইরে মনোনয়নের চিন্তা আওয়ামী লীগের

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:৫১

জিয়াউদ্দিন রাজু

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চারজন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে ও একজনের পদত্যাগের (ঢাকা-১০) মধ্যদিয়ে দেশের পাঁচটি আসন শূন্য হয়। শূন্য হওয়া এসব আসনের উপনির্বাচন নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ করছে ক্ষমতাসীন দলটি। তবে এ পাঁচটি আসনেই পরিবারতন্ত্রের বাইরে যেতে চায় দলটি। অর্থাৎ প্রয়াত সংসদ সদস্যদের স্ত্রী বা ছেলেমেয়েকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার বদলে নতুন কোনো জনপ্রিয় মুখকে সুযোগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে দলটি।

তবে শেষ পর্যন্ত শূন্য হওয়া এ পাঁচ আসনে কে হচ্ছেন নৌকার মাঝি তা আগামীকাল শনিবার জানা যাবে। এ দিন সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে এই পাঁচ আসনের উপ-নির্বাচন দলীয় মনোনয়ন সংসদীয় বোর্ডের সভায় প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত হবে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক সূত্র এ কথা জানিয়েছে।

সংসদ সদস্যদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনগুলো হলো বগুড়া-১, যশোর-৬, গাইবান্ধা-৩ এবং বাগেরহাট-৪। অন্যদিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে অংশ নিতে ঢাকা-১০ আসন থেকে পদত্যাগ করেন শেখ ফজলে নূর তাপস।

আসন্ন উপনির্বাচনে এ আসনগুলোতে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে পারিবারিক বলয়ের বাইরে নতুন কোনো জনপ্রিয় মুখকে সুযোগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে ঢাকা-১০ নিয়ে আওয়ামী লীগের চিন্তা ভিন্ন। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে নৌকার টিকিট শেষ পর্যন্ত আবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের কেউ মনোনয়ন পেতেও পারেন। তবে এবার এ আসনে নতুন মুখের আলোচনা বেশি শোনা যাচ্ছে। আসনটিতে গতকাল পর্যন্ত মোট সাত জন প্রার্থী আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেছেন। এ আসনের উপ-নির্বাচনের জন্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের নাম বেশ জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে তিনি এ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মনোনয়ন বোর্ডের সভা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বগুড়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান শিল্পী অথবা তার একমাত্র ছেলে সাখাওয়াত হোসেন সজল। তবে এ আসনে দলীয় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী করতে দলীয় মনোনয়ন উত্তোলন করেছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক সদস্য ম আবদুর রাজ্জাক। তিনি এরই মধ্যে সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বলে জানা গেছে। প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করাসহ উন্নয়ন এগিয়ে নিতেই তিনি প্রার্থী হতে ইচ্ছুক।

তবে পরিবার ও দল আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, সৎ, যোগ্য, জনপ্রিয় এবং যারা দলের জন্য নিবেদিত তারাই মনোনয়ন পাবে। আমাদের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভোটের মাঠের জরিপকে পাঁচ আসনের উপ-নির্বাচনে কাজে লাগাতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে ভোটের মাঠ এককভাবে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঢাকা সিটির নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঠে ব্যাপক উপস্থিতি ছিল।

দুই সিটির ভোটকে বিএনপি ব্যাপক গুরুত্ব দেয়, এমনকি হিসাব করে মাঠে নামে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রচারে বিপুল নেতাকর্মী নামিয়ে সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। ভোটের দিন কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণাও দেয় দলটি। যদিও শেষ পর্যন্ত দলটির নেতাকর্মীরা ভোটের দিন মাঠে ছিলেন না।

এসব বিষয় বিবেচনা করে সামনের নির্বাচনগুলোতে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি অংশ নেবে ও মাঠে থাকার চেষ্টা করবে ধরে নিয়েই আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্ধারণ করা থেকে শুরু করে নির্বাচনী কৌশল চূড়ান্ত করবে। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে ভোটের মাঠে যিনি বেশি জনপ্রিয়, তাকেই দল মনোনয়ন দেবে। পাঁচটি সংসদীয় আসনের উপ-নির্বাচন ঘিরে আগের মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের পরিবারের এক বা একাধিক জনের নাম ওঠে আসছে। এর মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত দুটি আসনে প্রয়াত সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তাদের বদলে গত নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত ত্যাগী কয়েকজন নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে দলে। পাশাপাশি আছে বিভিন্ন খাতে বিশেষ অবদান রাখা কয়েকজন তারকা ব্যক্তির নামও। তবে কোনো আসনের প্রার্থীই এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাঁচটির মধ্যে তিনটি আসনে (ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪) উপনির্বাচন আগামী ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

তিনটির তফসিল ঘোষিত হলেও জাতীয় সংসদের শূন্য পাঁচটি আসনের উপ-নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে (চসিক) আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দলীয় মনোনয়নপত্র একসঙ্গে বিক্রি করা হচ্ছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মনোনয়নপত্র বিক্রি ও জমা দেওয়া চলবে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। পাঁচটি আসন মিলিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দলটি প্রায় ৪৫ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গেছে।

এরই মধ্যে আসনগুলোতে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছে প্রয়াত সংসদ সদস্য ইউনুস আলী সরকারের বড় ছেলে ড. ফয়সাল ইউনুস গাইবান্ধা-৩ আসনে, প্রয়াত সংসদ সদস্য ডা. মোজাম্মেল হোসেনের পুত্রবধূ বাগেরহাট-৪ আসনে, প্রয়াত সংসদ সদস্য ইসমত আরা সাদেকের মেয়ে নওরীন সাদেক যশোর-৬ আসনে এবং প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান শিল্পী ও তাদের ছেলে মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সজল বগুড়া-১ আসনে দলের মনোনয়নে পেতে আগ্রহী।

অন্যদিকে তফসিল ঘোষণা না হওয়া দুটি সংসদীয় আসনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখনো নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো প্রস্তুতি নেওয়া শুরু না করলেও নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন। উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে এলাকায় তারা জনসংযোগও চালাচ্ছে অনেকে। তবে পরিস্থিতি, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও ভোটের মাঠ বিবেচনায় দলীয় সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, যারা যোগ্য, জনপ্রিয়, যারা দলের জন্য নিবেদিত, নেতাকর্মীদের কাছে যাদের জনপ্রিয়তা আছে, জনগণের কাছে আছে গ্রহণযোগ্যতা, তাদের এসব উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৭ ডিসেম্বর সংসদ সদস্য ইউনুস আলী সরকার, ১০ জানুয়ারি সংসদ সদস্য মোজাম্মেল হোসেন, ১৮ জানুয়ারি সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান এবং ২০ জানুয়ারি সংসদ সদস্য ইসমাত আরা সাদেক মারা যান। তাদের শূন্যতায় আসনগুলোতে উপ-নির্বাচনের পাল বইতে শুরু করেছে।

পিডিএসও/হেলাল