আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন

একঝাঁক নতুন মুখ আসছে নেতৃত্বে

অগ্রাধিকার পাবেন সাবেক ছাত্রনেতারা, কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকছেন ২০ নারী

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৩১ | আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:২৮

জিয়াউদ্দিন রাজু

আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে আসতে পারে ব্যাপক রদবদল। এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে দলটির নেতৃত্বে আসছে একঝাঁক নতুন ও তরুণ মুখ। জায়গা করে নিতে পারেন সাবেক ছাত্রনেতারা। বাড়ছে নারী নেতৃত্বের সংখ্যা। বাদ পড়তে পারেন বিতর্কিতরা আর মূল্যায়িত হচ্ছেন ত্যাগী, পরীক্ষিত ও ক্লিন ইমেজের নেতারা। বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদের প্রায় সবগুলোতে আসতে পারেন নবীনরা। যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে যারা টানা তিন সম্মেলনে একই দায়িত্বে ছিলেন, তাদের পরিবর্তনের সম্ভাবনা বেশি। সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে অন্তত দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হতে পারেন। আর ৮ সাংগঠনিক সম্পাদক পদের বেশির ভাগেই আসতে পারে নতুন মুখ। বর্তমান কমিটির অন্তত দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবার সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হতে পারেন। এ ছাড়া বাকি দুজন একই পদে বহাল কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হতে পারেন। সভাপতিমন্ডলীর সদস্য পদে এবার জেলা পর্যায়ের সিনিয়র, ত্যাগী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আনা হতে পারে।

জানা গেছে, বর্তমান কমিটির বেশ কয়েকজন সভাপতিমন্ডলীর সদস্য দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনুপস্থিতি থাকেন বলে বিতর্ক রয়েছে। এদের অনেকেরই আবার বয়স হয়েছে। তেমন কয়েকজন এবার পদ হারাতে পারেন। তাদের জায়গা হবে দলের উপদেষ্টা পরিষদে।

এবার জাতীয় সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন উঠলেও পাশাপাশি ‘ওই পদটি অপরিবর্তনীয় থাকছে’ বলেও আলোচনায় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের এক নেতা প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, অতীতে দলে অনেক জাতীয় নেতা ছিলেন। যাদের সারা দেশের মানুষ চিনত। তৃণমূল পর্যায়ের জনগণ ও নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তারা আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতেন। বর্তমানের সাধারণ সম্পাদকেরও এসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দলের সভাপতি চাইলে এ পদেও পরিবর্তন হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই মাপের নেতাই আসবেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ ছাড়া বাকি সব পদেই পরিবর্তন আসতে পারে। এ পরিবর্তনে দল থেকে কেউ বাদ যায় না, দায়িত্বের পরিবর্তন হয় মাত্র। চলমান শুদ্ধি অভিযানের প্রভাবও পড়বে কাউন্সিলে। যারা ইতোমধ্যে বিতর্কিত, তারা কমিটিতে স্থান পাবেন না। নতুন-পুরোনো মিলেই কমিটি হবে।

তিনি আরো বলেন, আবারও অক্লান্ত পরিশ্রম করতে প্রস্তুত রয়েছেন। তবে নতুন করে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তাকেও তিনি স্বাগত জানাবেন। তবে কাকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নেত্রীর এখতিয়ার।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সভাপতিমন্ডলী থেকে কেউ উপদেষ্টা, কেউ উপদেষ্টা থেকে সভাপতিমন্ডলীতে, যুগ্ম সম্পাদক পদ থেকে সদস্য কিংবা সদস্য থেকে যুগ্ম সম্পাদকও হতে পারেন। বাদও পড়তে পারেন অনেক প্রভাবশালী নেতা। সূত্র বলছে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সভায় বঙ্গবন্ধুর উদাহরণ টেনে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাও বলেছেন, মন্ত্রিত্ব ছেড়ে বঙ্গবন্ধু দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দলের সভাপতির এই বক্তব্যের মধ্যেও বিষয়টি স্পষ্ট।

তথ্যমতে, এবারের সম্মেলনে সরকার থেকে যদি দলকে আলাদা করা হয়, ফলে বেশির ভাগ পদে যারা সরকারে আছেন, তাদের দলে রাখা হবে না। যারা মনোনয়ন চেয়েও পাননি—এমন নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে পদোন্নতি পেতে পারেন মনোনয়নবঞ্চিত দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান। দুই সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। গত সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনের পদোন্নতির সম্ভাবনা বেশি। তৃণমূল থেকে উঠে আসা সাবেক ছাত্রনেতারা এবার ভালো পদ পেতে পারেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসাইনেরও পদোন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্মেলনের বিষয়ে আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রধান উদ্দেশ্য জনগণের আস্থা অর্জন করা। আওয়ামী লীগ জনগণের প্রত্যাশা ধারণ করা একটি সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। তৃণমূলের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে জনবান্ধব, সৎ-সাহসী ও যোগ্য নেতৃত্বকেই কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে পদায়ন করা হবে।

নেতৃত্বের বিষয়ে দেলোয়ার হোসাইন বলেন, সৎ, পরিচ্ছন্ন, ত্যাগী, দল ও দেশের জন্য ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে পারবে—এমন নেতৃত্বই আগামীতে আসবে।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলোর মতে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তালমিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য তরুণ ও মেধাবীদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সাবেক বেশ কজন নেতাকে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। সে হিসেবে বিবেচনায় আছেন—ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া নাসির, সাবেক ছাত্রনেতা ইসহাক আলী খান পান্না, বাহাদুর বেপারী, লিয়াকত শিকদার, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজল হায়দার চৌধুরী রোটন, এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, রাসেদুল বাশার ডলার, জিয়া উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া সিপু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ নেতা শেখ সোহেল রানা টিপু ও সাজ্জাদ শাকিব বাদশা।

বর্তমান কমিটিতে ১৫ জন নারী নেতৃত্ব রয়েছেন। পরবর্তী কমিটিতে নারীর নেতৃত্বের সংখ্যা বাড়ানো হবে। আগামী কমিটিতে ২০ জন নারীকে স্থান দেওয়া হতে পারে। সংশোধিত আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে (সদস্য পদ, ৫ এর ৪ অনুচ্ছেদ) বলা হয়েছে, আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ক্রমান্বয়ে পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদসহ সবস্তরের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে। নারী-পুরুষের সমতা আনার লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান হারে এই অনুপাত বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকিবে। সে অনুযায়ী নারী নেত্রীদের মধ্যে আসতে পারেন—সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী সোহেলী সুলতানা সুমি, শারমিন সুলতানা লিলি, সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি, তারানা লিপি, মেহের আফরোজ চুমকি, লুৎফুন্নাহার মুন্নী, মাহমুদা সুলতানা হেলেন, মাধুরি চক্রবর্তী মিলি, সাফিয়া খাতুন, নুরজাহান আক্তার সবুজ ও শমী কায়সারের নামও শোনা যাচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল