সর্বাত্মক আন্দোলন নিয়ে বিএনপিতে ২ ধারা

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৩:২৪

বদরুল আলম মজুমদার

আগামী ১২ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জামিন না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনে যেতে চায় বিএনপি। দলের মধ্যমসারির নেতাদের একাংশ তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে কঠোর আন্দোলনে যেতে চায়, কিন্তু বাদ সাধেন সিনিয়র নেতারা। তারা মনে করেন, সরকারের বর্তমান অবস্থা এমনিতেই খারাপ। বাকি মেয়াদে সরকার নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। তাই সরকারের মেয়াদের এক বছরের মাথায় বড় কোনো ঝুঁকি বিএনপিকে নিতে হবে না। এ অবস্থায় কঠোর আন্দোলন করে নেতাকর্মীদের আবার ঝুঁকির মুখে ফেলতে রাজি নন তারা।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার খালেদার জামিনের ওপর শুনানি ও আদেশের দিন ধার্য ছিল, কিন্তু সেদিন জামিন হয়নি। ওই জামিন শুনানির আগেও বিএনপির তরফ থেকে একই ধরনের কাগুজে হুমকি দিয়েছিলেন দলটির নেতারা।

সিনিয়র নেতারা একটু সময় নিয়ে একদফা আন্দোলনের পক্ষেই হাঁটতে চান। আন্দোলনের আশ্বাস না পেয়ে নিজ উদ্যোগে মাঠ গরম করার চিন্তা করছেন দলের মধ্যমসারির নেতারা। সম্প্রতি হাইকোর্টের সামনের ঘটনাকে তারা উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। এ নিয়ে দলের সিনিয়র নেতারাও অনেকটা চিন্তিত। তারা মনে করছেন, এ ধরনের আন্দোলনের ফলে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়তে পারে। এ ধরনের আন্দোলনে হিতে-বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। তাই দলের আশু করণীয় নির্ধারণে বিএনপির হাইকমান্ডের আলোচনা চলমান রয়েছে।

এ নিয়ে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আইনগতভাবে চেয়ারপারসনের মুক্তি না হলে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু আদালতের পদক্ষেপের অপেক্ষা করছেন তারা। পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর আস্থা রাখতে চায়। ১২ ডিসেম্বর জামিন না হলে স্পষ্ট হবে সরকারের বাধায় নেত্রীর জামিন হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে রাজপথে আন্দোলন করবে বিএনপি। তবে এখনই চূড়ান্ত আন্দোলনের চিন্তা বিএনপির পক্ষ থেকে করা হচ্ছে না। সর্বোচ্চ আদালত খালেদা জিয়াকে জামিন না দিলে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা ছাড়া বিএনপির সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। তিনি বলেন, চেয়ারপারসনের মামলা আদালতে রয়েছে, তাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দলের নেতাকর্মীরা ছোটখাটো কর্মসূচি পালন করছেন। আগেভাগে কর্মসূচি ঘোষণা করা না হলেও নেতাকর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে সভা-সমাবেশ-মিছিল করে যাবেন।

যুবদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘যুবদল গতকাল শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি পালন করেছে। গত শুক্রবার তারা মুগদা বিশ্বরোড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। তা ছাড়া গত বৃহস্পতিবার জামিনের শুনানি পেছানোর প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানীর গুলশানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে তারা। এভাবে চূড়ান্ত আন্দোলনের পথেই আছি আমরা।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আজ রোববার হাইকোর্টসহ সারা দেশের সব জেলা বারে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন।

এদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ইতোমধ্যে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আগামী ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভাগীয় শহরে সমাবেশ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এসব সমাবেশে ঢাকা থেকে যাবেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

বিএনপির দফতর-সংশ্লিষ্ট নেতারা বলেছেন, গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপিসহ এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নিয়েছেন। সভায় খালেদা জিয়ার জামিন না হলে দলের পক্ষ থেকে যে ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা আসবে তা রাজপথে থেকে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া সভায় মির্জা ফখরুল দলের নেতাকর্মীদের ভবিষ্যতে আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকারও নির্দেশনা দেন। সভা শেষে আজ রোববার ঢাকাসহ সারা দেশে জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, আইনগতভাবে খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য সর্বশেষ পথ হলো প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। এখানে জামিন না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে নেত্রীকে মুক্ত করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। দলের নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক দুই দফা বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে কী কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হবে, সে বিষয়ে তারা আমাদের কোনো নির্দেশনা দেননি। তবে শিগগিরই আমাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন বলে অপেক্ষা করছি।

পিডিএসও/হেলাল