যুবলীগের শীর্ষ পদে আলোচনায় দুঃসময়ের বাবলু

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২০:১৬ | আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:৫০

জিয়াউদ্দিন রাজু

কাউয়া, হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশের সঙ্গে তখনও পরিচিত ছিল না আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। ২০০১ পরবর্তী সময়ের কথা। তখন আওয়ামী লীগ করা ছিল পাপ। ক্ষমতার স্বাদ বা ক্রিম তখন বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোটে। উচ্ছ্বিষ্টভোগীরা তখন সেদিকেই। ছাত্রদেরও মোহ ছিল ছাত্রদল-শিবিরে। ছাত্রলীগের নাম নিলেই ঘোর অমানিশা নেমে আসতো ক্যাম্পাস জীবনে।

নিজের জীবন ও ক্যারিয়ারকে বাজি রেখেই খুব স্বল্পসংখ্যকই ছাত্রলীগ করতো। যারা করতো তারা আবার চারদলীয় জোট সরকার ও তাদের দলীয় ক্যাডার/দোসরদের নির্যাতনের পরাকাষ্টা সহ্য করে নানা পরীক্ষা দিয়ে খাঁটি সোনা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করিয়েছেন। এই খাঁটি সোনা আবার সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে নিপীড়নেও পরীক্ষিত। যার কারণে সে সময়কার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ধরা হয় আদর্শিক কর্মী হিসেবে।

তাদের একজন ইকবাল মাহমুদ বাবলু। ২০০১-এর এক অক্টোবরের নির্বাচনের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক। ২০০২ সালে সংকটের সময় একই হলের সাধারণ সম্পাদক হন। নানা নির্যাতন সয়েও হাল ছাড়েননি, আদর্শিক পতাকা হাতে এগিয়ে গেছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও হয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলনের এই অগ্রসেনানীর বর্তমানে আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক। এর আগে উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

জানা গেছে, ‘২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার।‌ নির্বাচ‌নের দিনগত রাতে যখন বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক ভো‌টে এগিয়ে ঠিক তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪টি হলের ছাত্রলীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মীরা ভয়ে পালিয়ে যায়। বিএনপি ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় মুহূর্ত। সেই মুহূর্তে ছাত্রদল নেতাকর্মী‌দের অত্যাচারের ভয়ে ছাত্রলীগের কেউ আর প্রতিবাদ করেনি। আর যারা করেছে, তাদের মধ্যে অনেক কর্মী নিজের জীবনকে বাঁচ‌াতে জহুরুল হক হলে আশ্রয় নেয়। কারণ তখন জহরুল হক হল ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের একটা শক্ত অবস্থান ছিল।

১৩ নভেম্বর, হঠাৎ করে জোরপূর্বক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরীকে অপসারণ করে রাতারাতি আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীকে ভি‌সি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারপর থেকেই শুরু হয় হল দখলের রাজনীতি। একে একে হলগুলো দখল করা শুরু করে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা।

হল দখলের প্রথম প্রস্তুতি হিসেবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের জগন্নাথ হলে আক্রমণ করে। সেদিন ওই হলে বৃষ্টির মতো গুলি করে ছাত্রদলের ক্যাডাররা। অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী সেদিন আহত হয়। তারপর জহুরুল হক হল দখল করার জন্য হামলা চালায়। সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মুস্তাফিজুল ইসলাম মামুন ও নাসির উদ্দিন পিন্টুর নেতৃত্বে ছাত্রদলের ক্যাডার বাহিনী জহুরুল হক হল দখলের জন্য আক্রমণ করে। সারাদিন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃ‌ষ্টি ক‌রে ছাত্রদ‌লের ক্যাডার বাহিনী। কিন্তু হ‌ল ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মইনুদ্দিন বাবু ভাইয়ের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটা শক্ত অবস্থান থাকায় সারাদিন হামলা করেও হল দখল করতে পারেনি। সে‌দিন সন্ধ্যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘেরাও করে জহুরুল হল। পরবর্তীতে হল ছাড়তে বাধ্য হয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওই সময় জহুরুল হক হলের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন ইকবাল মাহমুদ বাবলু।

এরপর ২০০২ সালে জহুরুল হক হলের ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে ছাত্রলীগের জহুরুল হক হলের সাধারণ সম্পাদক হন এই বাবলু । তারপর তার নেতৃত্বে হল ছাত্রলীগ ফের সংঘঠিত হয়। পূর্বে ছাত্রলীগের যে অবস্থান ছিল সেই অবস্থানে আবার ফিরে আসে। এদিকে, ২০০৩ সালের ৩১ জুলাই রাত ১টায় অতর্কিতভাবে জহুরুল হক হলে হামলা চালায় ছাত্রদল-শিবির। প্রথমে তৎকালীন ডেইলি স্টারের সাংবাদিক এবং জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক হাসান জাহিদ তুষারের ওপর হামলা চালায় (যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি)। তারপর সকল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উপর হামলা করে। এতে ছাত্রলীগের মিজান, মিঠু, রাজীব, তুহিন, ফরহাদ, জুয়েল, মফিজসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হয়।

জানা যায়, সে রাতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু দ্বিতীয় তলার মাঝামাঝি তার বন্ধুর রুমে ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ করছিলেন। সে অন্যরুমে থাকায় একা হয়ে যান। একদিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, অন্যদিকে তিনি। সে‌দিন রাতে ছাত্রদলের নেতাকর্মী‌ বাবলুকে এমনভাবে মারা হয় যা বলে প্রকাশ করার মতো না। মারতে মারতে তারা তাকে দুতলা থেকে নিচে ফেলে দেয়। তারা মনে করেছে মরে গেছে। বাবলুও বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরে আল্লাহর রহমতে তিনি বেঁচে যান।

হলের দুইজন কর্মচারী তাকে নিয়ে হলসংলগ্ন জহুরুল হক হলের সাবেক সভাপতি মাইনুদ্দিন বাবু ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যায়। তারপর অচেতন অবস্থায়ই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে‌দিন সকালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনা ও দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বাবলুসহ আহতদের দেখ‌তে যান। তারপর সুস্থ হয়ে আবারো দলের পাশে থেকে রাজনীতি করেন বাবলু; এখনও করছেন।

দুঃসময়ের সেই বাবলু আসছে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। এ বিষয়ে ইকবাল মাহমুদ বাবলু বলেন, ‘বিরোধী দলে, সেনাসমর্থিত সরকারের সময় তারপর এখন। সবসময় দলের সঙ্গে ছিলাম। আমাকে আমার নেত্রী যে পদেই রাখেন না কেন, এই দলেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো। পদের জন্য রাজনী‌তি ক‌রি না, ত্যাগের জন্যই রাজনী‌তি ক‌রি।’

পিডিএসও/তাজ/হেলাল