সম্রাটের মুখে বড় নেতাদের নাম

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে শুরু করেছেন। গত বৃহস্পতিবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব-১-এর কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানেই তিনি অনেক তথ্য দেন। এর আগে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদেও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদে অনেক রাঘববোয়ালের নাম প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-ডিবির একাধিক কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকালে সম্রাট ও আরমানকে র‌্যাব-১-এর কার্যালয়ে নেওয়ার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদের প্রাথমিক পর্যায়েই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে শুরু করেছেন সম্রাট। এমন তথ্য জানিয়েছে সূত্র।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয় থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী এনামুল হক আরমানকে মাদক ও অস্ত্র মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে র‌্যাব কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এ সময় ডিবি পুলিশ মামলার নথিপত্রও র‌্যাবকে বুঝিয়ে দেয়। এর আগে গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে সম্রাট ও আরমানের মামলার তদন্তভার পুলিশের কাছ থেকে র‌্যাবে ন্যস্ত করা হয়।

গত মঙ্গলবার সম্রাটের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অস্ত্র ও মাদক মামলায় ৫ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকার এক আদালত। একই সঙ্গে তার সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমানের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। মাদক মামলায় তাকে রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত।

সম্রাট ও আরমানকে র‌্যাব কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম। এদিকে গত দুই দিনে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন পুলিশের কাছে। জিজ্ঞাসাবাদে অনেক রাঘববোয়ালের নাম প্রকাশ করেছেন বলে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদে ক্লাবপাড়ায় জুয়া ও ক্যাসিনোর টাকার ভাগ এবং ফুটপাতে চাঁদাবাজি, টেন্ডাবাজির ভাগ পেতেন যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনসহ অর্ধশত নেতা। যারা সম্রাটের কাছ থেকে চাঁদার ভাগ পেতেন, তারা সবাই রাঘববোয়াল।

ডিবি সূত্র জানায়, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন ক্যাসিনোর টাকার ভাগ তো অনেকেই পেয়েছেন। শুধু তাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে? তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে? অন্যদের কেন নয়? তারা রাঘববোয়াল তাই তাদের গ্রেফতার করছেন না— প্রশ্ন রাখেন সম্রাট। তখন ডিবির কর্মকর্তারা সম্রাটকে বলেন, নাম প্রকাশ করলে সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে রাঘববোয়ালদের অনেকের নাম প্রকাশ করেন সম্রাট। তবে যাদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে না বলে ডিবির এক কর্মকর্তা জানান।

ডিবির ওই কর্মকর্তা বলেন, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদে দল ও দলের বাইরে আড়ালে থেকে এসব অপকর্মে কারা সহযোগিতা করতেন? কাকরাইলে ভূঁইয়া ম্যানশন দখল এবং সেখানে কারা যাওয়া-আসা করতেন, ক্যাসিনো ও টেন্ডার সিন্ডিকেটে কারা রয়েছেন—এসব বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সম্রাটকে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যুবলীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য ও পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারাও সম্রাটের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিতেন।

এদিকে ডিবি সূত্র জানিয়েছে, ক্যাসিনো, মাদক, অবৈধ মার্কেট ও দোকান থেকে মাসে সম্রাটের ১০০ কোটি টাকার বেশি আদায় হতো। ভাগবাটোয়ারা শেষেও বিপুল টাকা থাকত তার। এসব বিষয়ে সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে গতকাল তিনি অনেক তথ্য দিয়েছেন। মালয়েশিয়ায় সম্রাটের সেকেন্ড হোমের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। মালয়েশিয়ায় আরো অনেক নেতা সেকেন্ড হোম করেছেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন সম্রাট।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্রাটের সঙ্গে গ্রেফতার আরমানকে দিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করেছিলেন সম্রাট। বড় ভাইদের সৌজন্যে প্রায়ই বিভিন্ন পার্টি আয়োজন করা হতো। এসব পার্টিতে বড় বড় মডেলকে আমন্ত্রণ করতেন আরমান। আরমান নিজেও সিনেমা তৈরি ও পরিচালনায় যুক্ত হন সম্রাটের পরামর্শেই। কালোটাকা সাদা করার জন্য এই ব্যবসাকে সুবিধাজনক মনে হতো সম্রাটের। ক্যাসিনো ব্যবসাসহ সম্রাটের সব অপকর্মে মানিকজোড়ের মতো সঙ্গে ছিলেন আরমান।

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট আরো জানিয়েছেন, ক্যাসিনো তার পুরোনো অভ্যাস। এই অভ্যাসই তাকে এখন ভোগাচ্ছে। সম্রাট ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করার আগেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের এক নেতা হোটেল স্যারিনায় ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করেন। তাকে দেখেই সম্রাট তার সঙ্গীদের নিয়ে এ ব্যবসা চালু করেন।

প্রসঙ্গত, ৬ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রামে আত্মগোপনে থাকা সম্রাটকে গ্রেফতার করা হয়। তার সঙ্গে আরমানকেও গ্রেফতার করা হয়। পরে ঢাকায় এনে তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদও করে র‌্যাব।

৬ অক্টোবর দুপুরে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে র‌্যাব সদস্যরা কাকরাইলে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে সম্রাটের কার্যালয়ে অভিযান শুরু করে। এদিন নিজ কার্যালয়ে পশুর চামড়া রাখার দায়ে তার ছয় মাসের জেল দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। এরপর সম্রাটকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পিডিএসও/তাজ