দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এরপর কে?

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৫২

জিয়াউদ্দিন রাজু

দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানে আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগ নেতা যুবলীগের। সর্বশেষ গতকাল রোববার গ্রেফতার হয়েছেন যুবলীগ ঢাকা মহানগরের (দক্ষিণ) সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার অন্যতম সহযোগী এনামুল হক আরমান।

এর আগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, কৃষক লীগের শফিকুল আলমসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। অনেক রাঘববোয়ালও ধরা পড়বেন। তাহলে সম্রাটের পরে অভিযানের শিকার হবেন কে? সেই প্রশ্ন জাগছে জনমনে।

উল্লেখ্য, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সব ধরনের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক গোয়েন্দা শাখা। এরই মধ্যে তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গতকাল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এক জামায়াত নেতার বাসা থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে আটক করা হয়েছে। সম্রাটের রাজনীতি যুবলীগ থেকে শুরু হয়েছে বলে প্রচার হলেও একসময় তার সঙ্গে যুবদল নেতাদের যোগাযোগ ছিল। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাটের আদি বাড়ি ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলায়। যুবলীগে সম্রাটের রাজনীতি শুরু হয় ১৯৯১ সালে। মূলত রাজধানীর মতিঝিল থানার বিভিন্ন এলাকার স্পোর্টস ক্লাবগুলোয় জুয়ার আসরকে ক্যাসিনোতে উন্নীত করার মূল উদ্যোক্তা হলেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট।

অন্যদিকে সম্রাটের সহযোগী ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমানের নামে রয়েছে নানা অভিযোগ। তিনি সম্রাটের জুয়া আর ক্যাসিনোর সঙ্গে লিপ্ত ছিলেন বলেও জানা গেছে। অসামাজিক কার্যকলাপ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সম্রাট ও আরমানকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি।

এর আগে ক্যাসিনো-কাণ্ডে গ্রেফতার হয়েছেন আলোচিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তিনি একসময় ফ্রিডম পার্টি করতেন। পরবর্তীতে তিনি মির্জা আব্বাসের ক্যাডার হিসেবে ছাত্রদলে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি যুবলীগের সদস্য হন। পরে তিনি যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে যান।

আটক আরেক প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা জি কে শামীম। তিনি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন। যদিও যুবলীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, জি কে শামীম কখনোই যুবলীগের কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি নেতা হন বা না হন, যুবলীগের সঙ্গে যে তার সম্পর্ক ছিল; সেটা তার অফিস এবং বাসভবনে তল্লাশি করে সেই আলামত পাওয়া যায়। জি কে শামীমেরও উত্থান বিএনপির হাত ধরে। পদ ব্যবহার করে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন, টেন্ডারবাজি করেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং চাঁদাবাজিও করেছেন।

আটক আরেক নেতা কৃষক লীগের শফিকুল আলম। কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ আছে। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল; তখন বিএনপির প্রভাব খাটিয়ে নানরকম অপকর্মে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েন। সেই সঙ্গে তিনি সন্ত্রাস এবং যাবতীয় অপকর্ম অব্যাহত রাখেন।

আটক হয়েছেন মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। গ্রেফতার বিসিবি পরিচালক ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া এখনো বিএনপির রাজনীতি করলেও প্রকাশ্যে করেন আওয়ামী লীগ। বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু লোকমান। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির মধ্য সারির নেতা ছিলেন তিনি। মোহামেডান ক্লাবে ফালুকে সভাপতি করে লোকমানই জুয়ার আসর বসান।

আরেক আটক নেতা গেন্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও রুপম ভূঁইয়া। গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও সহসম্পাদক রুপম ভূঁইয়া। কোনো পেশার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না এই দুই ভাই। অথচ র‌্যাবের হাতে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় এনু ও রুপমের বাড়ি রয়েছে ১৫টি। তাদের মালিকানাধীন ভল্ট খুলে নগদ প্রায় পাঁচ কোটি টাকাসহ সাড়ে আট কেজি স্বর্ণ (৭৩০ ভরি) পেয়েছে র‌্যাব। ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে এর সঙ্গে। ক্যাসিনোর টাকার সন্ধান করতে গিয়ে এই দুই নেতার এমন সম্পদের ভাণ্ডার মিলল র‌্যাবের হাতে। এখন পর্যন্ত ১৫টি বাড়ির কথা জানা গেলেও ঢাকা শহরে এনু ও রুপমের প্রায় ৫০টি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে ধারণা র‌্যাব কর্মকর্তাদের।

গ্রেফতার তালিকায় আরো রয়েছেন মো. শফিকুল ইসলাম। যিনি যুবলীগের আইসিটি-বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন। শফিক এন্টারপ্রাইজ নামে তার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যিনি শিক্ষা ভবনে টেন্ডারবাজিসহ নানারকম অপতৎপরতায় জড়িত। তিনিও একসময় শিবিরের রাজনীতি করতেন এবং ছাত্রদলের হাত ধরে যুবলীগে আসেন।

এদিকে আটকদের মধ্যে আলোচিত অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধান। ঢাকার অপরাধ জগতের ডন তিনি। পশুর খাটালে চাঁদাবাজি, হোটেল, স্পা, ক্যাসিনো পরিচালনাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের অনলাইনের মাধ্যমে ক্যাসিনো ব্যবসা চালাতেন সেলিম। অনলাইনে কয়েন বিক্রি করে এই ক্যাসিনো চালানো হতো। এসব করে কামিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

গ্রেফতার অভিযানে প্রায় সবার কাছে থেকে মোটা অঙ্কের টাকা, অবৈধ অস্ত্র, সোনা, মাদক জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে সম্রাটের কাছ থেকে কী পাওয়া গেছে, তা এখনো জানা যায়নি।

এ পর্যন্ত ৮ ক্যাসিনো হোতা আটক হলেও অধরা রয়ে গেছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার ও কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। এরা দুজন সম্রাটের ক্যাসিনো ব্যবসার দেখভাল করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে সাঈদ অভিযান শুরুর পর থেকে সিঙ্গাপুরে পলাতক। আর আবু কাওসার কিছুদিন দেশের বাইরে থেকে এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনোর ছড়াছড়ি। এর মধ্যে ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্রাটের শিষ্য খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন সম্রাটের লোকজন।

মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর ১৮ অক্টোবর থেকে ছোট-বড় মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ৪০টির মতো অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

পিডিএসও/তাজ