শুদ্ধি অভিযানে অপরাধীরা আতঙ্কে, খুশি তৃণমূল

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৩৬

জিয়াউদ্দিন রাজু

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অপরাধের বিভিন্ন মহলে। চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, অবৈধ প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নানা রকম দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আছে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। চলমান অভিযানে দেখানো হচ্ছে জিরো টলারেন্স।

শুধু সহযোগী সংগঠনই নয়, খোদ আওয়ামী লীগেও যারা এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব অভিযানে খুশি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আর আতঙ্কে রয়েছেন নানা অপরাধে জড়িত নেতারা।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের যেসব নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলের প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, এমন বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। এ ছাড়া যারা অন্য দল বদল করে এসে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিষয়ে ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে। শুদ্ধি অভিযানের এই পর্বে আতঙ্কে রয়েছেন দুর্নীতিবাজ নেতারা। এদের অনেকে গা-ঢাকা দিতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ চলাফেরা করছেন খুব সতর্কতার সঙ্গে।

এমন অভিযানে খুশি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দলের দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে সমর্থন জানিয়ে তারা বলছেন, একসময় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি করতেন, এমন অনেক নেতাই বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে জায়গা করে নিয়েছেন। অনেকে নেতাদের সঙ্গে ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি করে টাকার পাহাড় গড়েছেন। ক্ষমতার প্রভাব-বলয় তৈরি করে রেখেছেন তারা। তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো দরকার বলে মত তাদের।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের অনেক নেতাই রয়েছেন, যারা গত ৫ বছর আগে বাস করতেন ভাঙা ঘরে, রিকশা ভাড়াও দিতে পারতেন না, এখন তার সুরম্য অট্টালিকায় বাস করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। আগামী সম্মেলন পর্যন্ত এটা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সম্মেলনের জন্যও সব ধরনের প্রস্তুতি নেবে আওয়ামী লীগ।

এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, শুধু ছাত্রলীগ-যুবলীগের প্রশ্ন নয়, আওয়ামী লীগেও এসব অপকর্ম যদি কেউ করে থাকেন, তারও খোঁজখবর প্রধানমন্ত্রী নিচ্ছেন। দুর্নীতি, অপকর্ম, শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য অনেকেই নজরদারিতে আছেন। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা শুধু যে রাজধানীকেন্দ্রিক তা নয়, সারা দেশে যেখানেই অপকর্ম, দুর্নীতি, অনিয়ম হবে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ হবে— সর্বত্রই একই নিয়মে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কার্যকর হবে। তিনি আরো বলেন, ‘দুর্নীতি, অনিময়, বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যারা জড়িত, যাদের অচরণে পার্টি এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, ঠিক তাদের বিরুদ্ধেই কেইস টু কেইস খোঁজ খবর নিয়ে অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে।’

জানা গেছে, সর্বশেষ জি কে বিল্ডার্সের মালিক এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে আটক করে র‌্যাব। নিজেকে তিনি যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। একসময় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ক্যাডার ছিলেন জি কে শামীম। বিএনপি আমলে জি কে শামীমের ভয়ে রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, শান্তিনগরের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াতেন। সে সময় মির্জা আব্বাসের ডান হাত হিসেবে গণপূর্ত ভবনের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন এই শামীম।

সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক এক সভাপতির বিরুদ্ধেও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে টাকা কামিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ার আগে তিনি যুবদল করতেন।

এদিকে শোভন-রাব্বানীর পরিণতি দেখে যারা তাদের চারপাশে ছিলেন, তাদের হয়ে যারা টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারাও আতঙ্কে রয়েছেন। একই আতঙ্কাবস্থা দেখা দিয়েছে যারা আওয়ামী লীগের নামে মাদক ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যেও। তারা কয়েক দিন ধরে সাংগঠনিক যোগাযোগও বন্ধ রেখেছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট হাজারখানেক নেতাকর্মী নিয়ে রাজধানীর কাকরাইলে সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন।

ইতিমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপরাধের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ তালিকায় যুবলীগ ছাড়াও শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতারাও রয়েছেন।

সম্প্রতি ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের পর গত বুধবার বিকেল থেকে রাতভর র‌্যাব রাজধানীর চার ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেয়।

পিডিএসও/তাজ