যুবলীগে শুদ্ধি অভিযান, আত্মগোপনে অনেকে

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:২৩ | আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:৫৪

জিয়াউদ্দিন রাজু
যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদের ইয়াং ম্যান্স ক্লাবের ক্যাসিনোতে র‌্যাবের অভিযান

বিতর্কে জড়িয়ে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার পর এবার শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে যুবলীগে। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী এ সংগঠনের ব্যানারে থাকা দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজ এবং অস্ত্রবাজদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগের কতিপয় নেতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘এরা দানবের চেয়েও খারাপ। আমার দলে এই দানবদের দরকার নাই। এরা দলকে, রাজনীতিকে কিছু দেয় না। এরা দলের বোঝা। সংশোধন না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করেছি, এদেরও সেভাবেই দমন করব।’ খোদ প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় আরো ‘ভয়’ জাপটে ধরেছে যুবলীগ নেতাদের। অভিযানের হাত থেকে বাঁচতে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও হেভিওয়েট নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কেউ আবার রয়েছেন আত্মগোপনে। তারা ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছেন।

এদিকে তাদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর মতিঝিলের ফকিরাপুল এলাকায় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদের ‘ইয়াং ম্যান্স ক্লাব’-এর ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এই ক্লাবের মালিক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকেও আটক করা হয়েছে। ক্লাবটি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থসহ আটক হয়েছে ১৪২ জন। বুধবার বিকেলে অভিযান শুরু করে র‌্যাব ৩-এর একটি দল। এতে নেতৃত্ব দেন র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম ও র‌্যাব ৩-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান।

সূত্র জানায়, যুবলীগের কয়েকজন নেতা দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নানা অপকর্মের তথ্য আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার এসব নেতার অপকর্ম ফাঁস করে দিতে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে যেসব যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের অনেকেই অসুস্থতার ভান করে ইতোমধ্যে দেশের বাইরে চলে গেছেন; অনেকেই যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

এদিকে কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা গত দুই মেয়াদে যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা নানা অপকৌশলে বা একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়েও কথা বলেছেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুবলীগের মহানগর উত্তর-দক্ষিণের প্রায় সব নেতা ঢাকায় ক্যাসিনো পরিচালনা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে যুবলীগের মাসব্যাপী কর্মসূচি পালনের বিষয়টি অবহিত হলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘চাঁদাবাজির টাকা হালাল করতে আমার জন্মদিন উপলক্ষে কর্মসূচি নিয়েছে যুবলীগ। এরা দলের বোঝা। আমি এসব চাই না। এরা দলকে, রাজনীতিকে কিছু দেয় না। সংশোধন না হলে এ দেশে জঙ্গি যেভাবে দমন করেছি, সন্ত্রাসী বাহিনীও সেভাবে দমন করব।’

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড নেতারা বলেছেন, যুবলীগের শুদ্ধি অভিযান বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য হুশিয়ারি দেওয়ায় সংগঠনের অভিযুক্তরা এখন আতঙ্কিত। বিশেষ করে গত দুই মেয়াদে যারা চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকৌশলে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, এখন তারা চরম উদ্বেগ-আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কোনোভাবে তদবির করে নিজের নাম দলের গুড লিস্টে আনা যায় কি না; সেজন্য অনেকেই পথ খুঁজছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বিষয়ে শিথিল না থাকার কারণে আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারাও কোনো অভিযুক্তকে সহানুভূতি দেখাতে নারাজ।

সব মিলিয়ে ছাত্রলীগের পর এবার যুবলীগের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা আওয়ামী লীগে নেই। যারা দুর্নীতিতে জড়িত, তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলা আছে।

অভিযুক্তদের বিষয়ে আওয়ামী যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বলেছেন, যুবলীগের বিভিন্ন ব্যক্তি ও কমিটির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। যুবলীগ অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানায়। বিজ্ঞপ্তি আরো বলা হয়েছে, সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে; সেগুলোর ব্যাপারে যুবলীগ নিজস্ব ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তদন্ত করবে। কোনো নেতা বা কোনো শাখার বিরুদ্ধে যদি কারো অভিযোগ থাকে, তাহলে তা আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠাতে বলা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যুবলীগের কোনো নেতা বা শাখার (যে পর্যায়েরই হোক না কেন) বিরুদ্ধে ন্যূনতম অভিযোগেরও যদি সত্যতা পাওয়া যায়; তাহলে যুবলীগ তাৎক্ষণিকভাবে ওই ব্যক্তি ও কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

অন্যদিকে যদি এই অভিযোগ ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পরে, তাহলে সংশ্লিষ্ট থানায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগটি প্রেরণ করবে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওই থানাকে অনুরোধ করবে।

পিডিএসও/হেলাল