চূড়ান্ত বিভক্তির পথে জাপা

দুই অংশে চলছে দল ভারীর প্রতিযোগিতা

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৪১

বদরুল আলম মজুমদার

চূড়ান্ত বিভক্তির পথে চলছে জাতীয় পার্টি। আর এই বিভক্ত নেতাদের মধ্যে চলছে নিজ নিজ অংশে দল ভারী করার প্রতিযোগিতা। নিশ্চিত বিভাজনের দিকেই হাঁটছেন দলটির বিভক্ত নেতারা। পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে আনুষ্ঠানিক বিভাজন এখন সময়ের ব্যাপার। রওশন এরশাদ নিজেকে জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করার পরপরই গতকাল রংপুরসহ দেশের কিছু কিছু জায়গায় তার বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। জি এম কাদেরের পক্ষে থাকার জন্য ব্যাপক যোগাযোগ শুরু করেছেন তার সমর্থকরা।

অন্যদিকে রওশনের পক্ষেই সরকারের সমর্থন থাকবে— এমন প্রচার চালিয়ে রওশনপন্থিরাও দল ভারীর চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতিতে শক্তিশালী তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপে নতুন কিছু ঘটে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। ওই পক্ষের সমর্থনে একপক্ষের কপাল খুলতে পারে আর তাদের হাতেই থাকবে জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ আর এ পক্ষই লাভ করবে লাঙ্গল প্রতীক। এর বিপরীতে আরেক পক্ষের কপাল পুড়বে।

গত দুদিনে জাতীয় পার্টিতে নেতাকর্মীরা কার পক্ষে আছেন- এই হিসাব নিয়েই দিনভর ব্যস্ত দুই অংশের নেতারা। দুই অংশে নেই এমন নেতাদের কদর বাড়ছে। এ নিয়ে নেতারা হিসাবনিকাশ করছেন, করছেন চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ ছাড়া সরকারের সমর্থন কোন পক্ষে যায়, সেদিকেও তীক্ষè নজর রাখছেন নেতারা। পার্টির শীর্ষ পদ নিয়ে টানাটানি চললেও রওশনপন্থি এবং জি এম কাদেরপন্থি উভয় পক্ষই মশিউর রহমান রাঙ্গাকে নিজেদের মহাসচিব দাবি করছেন। তবে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেননি। জি এম কাদের দাবি করেছেন, রাঙ্গা তাদের পক্ষেই আছেন।

অন্যদিকে গত পরশু রওশনের সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানিয়েছেন, মশিউর রহমান রাঙ্গাই হবেন চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের নতুন মহাসচিব। এ বিষয়ে রাঙ্গার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের

চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাঙ্গার সমালোচকরা বলছেন, তিনি আসলে দেখতে চাইছেন, শক্তির পাল্লা কোনদিকে ভারী। শেষ পর্যন্ত কে হবেন বিরোধী দলের নেতা। সেটা দেখেই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবেন তিনি। আবার কোনো পক্ষেরই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না রাঙ্গা।

এদিকে জাতীয় পার্টির সৃষ্ট কোন্দলে কারোর দিকে তাকানোর সময় নেই বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি সংসদের বিরোধী দল হ?লেও, সেই দলের ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ নিয়ে আওয়ামী লীগের মাথা ঘামানোর মতো সময় নেই। এটা তাদের নিজেদের ব্যাপার। জাতীয় পার্টিতে আমরা হস্তক্ষেপ করব না। তাদের দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ কারো পক্ষ নেবে না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জাতীয় পার্টি রংপুরকেন্দ্রিক একটি আঞ্চলিক দল। সারা দেশে তেমন সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। রংপুর থেকেই ‘এরশাদের জনপ্রিয়তাকে’ কাজে লাগিয়ে দল পরিচালিত হবে। এই বিবেচনায় জি এম কাদেরপন্থিরা এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে রওশন এগিয়ে রয়েছেন বলে দাবি। তবে রংপুরে তাদের অবস্থান দুর্বল। যদিও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সমর্থন রওশনপন্থিদের দিকে বলে দাবি তাদের।

রওশনপন্থি এমপি ফখরুল ইমামের ভাষ্য, গঠনতন্ত্র মোতাবেক তো জি এম কাদের দলের কো-চেয়ারম্যান। সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রেসিডিয়ামের সঙ্গে কোনো বৈঠক না করে, আলোচনা না করে বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে স্পিকারকে জি এম কাদের চিঠি দিয়েছেন, এটা অন্যায় হয়েছে।

জি এম কাদের এবং রওশন এরশাদের বাইরেও অনেকেই দলের চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। এ ছাড়া মহাসচিব পদ পেতে কলকাঠি নাড়ছেন রুহুল আমিন হাওলাদারও। এর বাইরে মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আরো আছেন কাজী ফিরোজ রশীদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। এ ছাড়া দলের মিডিয়া উইং, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও চেয়ারম্যান কার্যালয় জি এম কাদের অনুসারীদের দখলে। দৃশ্যত জি এম কাদের এগিয়ে আছেন। তা ছাড়া তৃণমূলের সমর্থনও তার পক্ষে বেশ ভালো বলে জানা গেছে।

জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, রওশন এরশাদের সঙ্গে জি এম কাদেরের দ্বন্দ্ব ৯০-দশকেই শুরু। এরশাদের জীবদ্দশাতেই একাধিকবার তা দৃশ্যমান হয়। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেও দুই নেতার দ্বন্দ্ব হয়েছে। এরপর ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জাতীয় পার্টির কর্মী-সম্মেলনে এরশাদ তার ছোট ভাই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিলে ফের বেঁকে বসেন রওশন। পরে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন এরশাদ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে কাদেরকে বেছে নেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন এরশাদ। কিন্তু গত ২২ মার্চ পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে জি এম কাদেরকে সরিয়ে দেন। আবার গত ৪ মে প্রায় মধ্যরাতে সাংবাদিকদের ডেকে এরশাদ জানান, তার ভাই জি এম কাদেরই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হবেন। এরশাদ মারা যাওয়ার পর আর কোনো বিরোধিতা না করলেও এবারই প্রথম জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে গেলেন রওশন।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের : ফিরোজ রশীদ

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়াম্যান নির্বাচনের ব্যাখ্যা দিলেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্রের ২০/১-ক উপধারা অনুযায়ী পার্টির চেয়ারম্যান যে কাউকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে পারবেন। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘোষণা অনুযায়ী তার মৃত্যুর পর জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান।’ গতকাল শুক্রবার রাতে বনানীর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘এরশাদ জীবিত অবস্থায় বলে গেছেন, আমার মৃত্যুর পর জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান হবেন। পার্টির নেতাকর্মীরা তার নির্দেশমতো চলবেন। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এর ফলে জাপার বিভিন্ন জেলার নেতাদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, জাপার গঠনতন্ত্রের বাইরে কারো পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়।’

জাপার এই নেতা আরো বলেন, ‘পার্টির গঠনতন্ত্রের কোথাও লেখা নেই, দলের সংসদীয় কমিটি বৈঠক করে ঠিক করবে, কে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, কে উপনেতা হবেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান ঠিক করবেন কে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, কে উপনেতা হবেন।’

দলের সংসদ সদস্যদের ১৫ জন সমর্থন দিয়ে জি এম কাদেরকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা করতে স্বাক্ষর করে স্পিকারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ফিরোজ রশীদ। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ আগস্ট দলের প্রেসিডিয়াম সভা ছিল, সেখানে ৩৪ জন উপস্থিতির মধ্যে ২৬ জন বক্তব্য দিয়েছেন। তারা সবাই বলেছেন, দলের সভাপতিই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন। সেই অনুযায়ী ১৫ জন সংসদ সদস্য চিঠিতে স্বাক্ষর করে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন।’

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকে গত দুদিন কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি কোথায় আছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘তিনি কোথায় আছেন, আমরা জানি না। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কোথায় আছেন। তবে জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে স্পিকারকে দেওয়া ১৫ জন সংসদ সদস্যের চিঠির মধ্যে রাঙ্গা প্রথম স্বাক্ষর করেছেন।’

দলটির আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, ‘গতকাল আমাদের দলের এক সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য (আনিসুল ইসলাম মাহমুদ) জাতীয় পার্টির একজনকে (রওশন এরশাদ) চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেছেন; যা গঠনতন্ত্রবিরোধী ও অবৈধ।’ তার মতো সিনিয়র নেতার কাছে কাদেরপন্থি নেতারা এমনটা আশা করেন না বলেও তিনি জানান।

পিডিএসও/তাজ