জাতীয় পার্টিতে ভাঙনের সুর

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:৫৫ | আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:০৪

বদরুল আলম মজুমদার

নানা নাটকীয়তায় জাতীয় পার্টির অবস্থা টালমাটাল। দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই ঘোলাটে হচ্ছে। আবার নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলে ভাঙনের সুর বেজে উঠেছে দলটিতে। বিরোধী দলীয় নেতার পাশাপাশি রওশন এরশাদ নিজেকে দলের চেয়ারম্যান দাবি করে বসেছেন।

এ বিষয়ে জি এম কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, কেউ ঘোষণা দিলেই রাজা হয়ে যায় না। দলের শৃঙ্খলা ভঙের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টিতে ভাঙন দেখেছেন দলটির অনেক নেতাকর্মীই। তবে দলে আলোচনা আছে সরকারি দলের হস্তক্ষেপে হয়তো পরিস্থিতি পাল্টেও যেতে পারে; তেমনটা ঘটলে সংসদের বিরোধী দলের নেতা হতে পারেন রওশনই।

সংকট শুরু হয় মূলত বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন প্রশ্নে। রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের দুজনই সংসদের বিরোধী দলের নেতা হতে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। এ নিয়ে গত দুই দিনে চলে চিঠি চালাচালি। এখন বিষয়টি নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সংসদ সদস্যরা দুই শিবিরে বিভক্ত। একপক্ষ চায়, জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে; অন্যপক্ষ রওশন এরশাদকে। এর বাইরে রংপুরের দলীয় মনোনয়ন ইস্যুটিও এই বিবাদের সূত্রপাত মনে করছেন কেউ কেউ। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির এবারের সংকট শেষ পর্যন্ত ভাঙন পর্যন্ত গড়ানোর অবস্থায় ঠেকেছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা। একের পর এক ঝামেলা দলটিকে সেই পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদে এরশাদ মারা যান গত ১৪ জুলাই। এর দুই দিন পর সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় এরশাদের ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে। এ নিয়ে এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টিতে শুরু হয় ক্ষমতার রশি টানাটানি। যার আনুষ্ঠানিক পরিণতি পেল গতকাল রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণার মধ্য দিয়ে। মৃত্যুর আগে নিজ ভাই জি এম কাদেরকে নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা দেন এরশাদ। সেই সূত্রে, দলীয় ফোরামের সর্বো”” মতামতের ভিত্তিতে চেয়ারম্যানের আগে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটি উঠিয়ে দেন জি এম কাদের।

নতুন নাটকীয় পরিস্থিতির মুখে গতকাল দুপুরে রাজধানীর গুলশানে রওশন এরশাদের বাড়িতে পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন করে তাকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। রওশনের পক্ষে এ ঘোষণা দেন দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এদিকে রওশন এরশাদের বাড়িতে যখন সংবাদ সম্মেলন চলছিল, তখন বাইরে কয়েক হাজার নেতাকর্মী স্লোগান দিচ্ছিলেন। রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়ে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় পার্টির কাউন্সিল হবে। এর আগে সংসদে বর্তমানে বিরোধীদলীয় উপনেতা জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ বলেন, পার্টিতে কী হচ্ছে? জাতীয় পার্টি কী আবার ভাঙতে যাচ্ছে? অতীতে কিন্তু জাতীয় পার্টি ভেঙেছে। আসুন সবাই মিলে পার্টিটাকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করি।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সোহেল রানা, সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, সংসদ সদস্য মজিবুল হক চুন্নু, সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান, সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম, সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম ওমর, প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফয়সল চিশতী, মীর আবদুস সবুর আসুদ ও সফিকুল ইসলাম সেন্টুসহ অন্যরা।

রওশনের সংবাদ সম্মেলনের পরপরই সংবাদ মাধ্যমের সামনে আসেন জি এম কাদের। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কেউ ঘোষণা দিলেই রাজা হওয়া যায় না। এমনকি নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা দিয়ে কেউ সম্রাট হতে পারেন না। এরশাদের ঘোষিত এ চেয়ারম্যান আরো জানান, পার্টির শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিন বছর পর পর পার্টির কাউন্সিল হওয়ার কথা। সে সময় এসে গেছে। আমরা খুব তাড়াতাড়িই পার্টির কাউন্সিল করে ফেলব। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদের নাম ঘোষণার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। তিনি আমার মায়ের মতো। আর উনিতো সংবাদ সম্মেলনে নিজে থেকে তার নাম ঘোষণা করেননি। অন্য একজন তার নাম করেছেন। পুরো বিষয়টা খতিয়ে দেখা হবে।

রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণায় দলে ভাঙন সৃষ্টি হলো কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে জি এম কাদের বলেন, কেউ নিজেকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিলেই জাতীয় পার্টির ভাঙন হবে না, আর আমি চেয়ারম্যান হয়েছি বৈধভাবে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মৃত্যুর আগে এক চিঠির মাধ্যমে আমাকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেছেন। সেই হিসেবে আমিই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান।

এ অবস্থায় দলের নেতারা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব কোন দিকে যাবে না নিয়ে কৌতূহলী দলের তৃণমূল নেতারা। তবে তারা কেউ দলের ভাঙন চাচ্ছেন না। এ বিষয়ে রওশনপন্থি দলের নেতারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যাকে সমর্থন দেওয়া হবে, তিনিই শেষ পর্যন্ত সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসবেন। এই ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে আছেন রওশন এরশাদ। তিনি ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে এরশাদের নির্বাচন বয়কট করা, একেক সময় একেক রকম আচরণ করলেও সরকারে ইচ্ছা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ছিলেন রওশন এরশাদ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রওশনপন্থি এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, এ বিষয়ে এখনো সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনো বৈঠক কিংবা অফিশিয়াল আলাপ হয়নি। এমনিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কারো কারো সঙ্গে কথা হয়েছে।

অন্যদিকে জি এম কাদেরপন্থি নেতারা বলছেন, দলের তৃণমূলসহ অধিকাংশ নেতারা জি এম কাদেরের পক্ষে। তাই দলের কাউন্সিল হোক বা যেভাবেই মতামত নেওয়া হোক জি এম কাদের রওশন থেকে এগিয়ে থাকবেন।

প্রসঙ্গত, এর আগে জাতীয় পার্টি ছেড়ে একই নামে দল গড়েন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান মঞ্জু, আবদুল মতিন ও কাজী জাফর আহমেদ।

পিডিএসও/হেলাল