এরশাদের অবর্তমানেও সংহত থাকছে জাপা

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৯, ০৮:২৫

বদরুল আলম মজুমদার

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর দল টিকবে কি না তা নিয়ে জনমনে সংশয় থাকলেও, সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য বেশ তৎপর রয়েছেন পার্টির সিনিয়র নেতারা। তারা মনে করছেন, জাতীয় পার্টি আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ এবং যেকোনো সময়ের চেয়েও শক্তিশালী। এভাবেই রাজনীতির মাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে দলটি। যেকোনো মূল্যে জাতীয় পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রশ্নে দলটির সিনিয়র নেতারা এখন একমত রয়েছেন।

এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ এবং এরশাদের ভাই জি এম কাদেরের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। উভয়ের সম্পর্কের টানাপড়েনের ঘটনা অস্বীকার করছেন নেতারা। তারা বলছেন, জি এম কাদের চেয়ারম্যান না ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এটি নিয়ে যে বির্তক আছে—সেটি একটি ষড়যন্ত্র। দলের ৪-৫ জন বর্ষিয়ান নেতা নিজেদের কদর বাড়াতে মূলত এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে তাদের ধারণা।

পার্টির একটি সূত্র জানায়, রওশন এরশাদ শেষ বয়সে এসে এমন একটি বিতর্কের জন্ম দিতে রাজি ছিলেন না। গুটিকয়েক নেতা নিজেদের স্বার্থে তাকে ভুল বুঝিয়ে বিষয়টির অবতারণা করেছেন। যাতে চেয়ারম্যান প্রশ্নে জি এম কাদেরকে চাপে রাখা যায়। জি এম কাদের প্রশ্নে সর্বশেষ সংসদ থেকে যে বিবৃতি রওশনের নামে দেওয়া হয় সেটিও একই মহলের তৎপরতা বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, দলটির তৃণমূল জি এম কাদেরের নেতৃত্ব মেনে নেওয়ায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। তারাই রওশন এরশাদকে পুঁজি করে পার্টিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এমন বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন। দল পরিচালনায় জি এম কাদের ‘উপযুক্ত’ নয় বলে প্রচারণা চালায় পার্টির মধ্যম স্তরে। এসব নেতারা পার্টির সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে থাকছেন।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এরশাদের শূন্য আসনে পার্টির মনোনয়নের ওপরই দলের মধ্যে ফাটল রয়েছে না কি দলটি ঐকমত্যে রয়েছে তা অনেকখানি বোঝা যাবে। মনোনয়ন পেতে এরই মাঝে একজন রওশনের সমর্থন নিয়ে রেখেছেন। এমন অবস্থায় দলের একক প্রার্থী ঘোষণায় দলের ঐক্য ও সংহতি বোঝা যাবে।

জানতে চাইলে পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, আগেও বলেছি ভাবির (রওশন এরশাদ) সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। উনি আমাকে ছোটবেলা থেকে সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। উনি আমার মাথার ওপর বটগাছের ছায়ার মতো থাকবেন। উনি যেভাবে আমাকে দিকনির্দেশনা দেবেন পার্টি সেভাবেই পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, কিছু সমস্যা রয়েছে। সেটি সব দলেই থাকে। এর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছি। খুব শিগগিরই সমাধান হবে আশা করি। রংপুর-৩ শূন্য আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী প্রসঙ্গে বলেন, দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। এই নিয়ে দ্বন্দ্বের কোনো অবকাশ নেই।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আরো বলেন, আমরা সারা দেশের সাংগঠনিক কাঠামোর পর্যালোচনা করছি। কোথায় কী কী সমস্যা আছে তা দেখছি। এজন্য একটি টিম করেছি, তারা বিষয়গুলো দেখভাল করছেন। আশা করি অল্প দিনের মধ্যে দলকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হব। তাছাড়া আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর অনেকেই জাতীয় পার্টিতে আসার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। অনেকে এসেছেনও। বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা জাতীয় পার্টিতে যোগ দেবেন বলে আশা করেন তিনি।

জানা যায়, এরশাদের অবর্তমানে তার দলটি ভাঙনের মুখে পড়ুক তা চান না রওশন এরশাদও। রওশনের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দলীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে যেকোনো সিদ্ধান্ত রওশনের সঙ্গে পরামর্শ করলে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

জি এম কাদের পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যান নন—এ মর্মে ২২ জুলাই গভীর রাতে রওশন এরশাদসহ পার্টির দশজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এমপির নামে যে বিবৃতি প্রকাশ পেয়েছিল তাতে স্বাক্ষর দিতে রাজি ছিলেন না রওশন এরশাদ। পার্টির কয়েকজন অতি উৎসাহী প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশনকে অনেকটা ভুল বুঝিয়ে ও কাকুতি-মিনতি করে এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করান। ওই বিবৃতিতে নাম থাকা ৯ জনের মধ্যে ছয়জনই জানান, এমন কোনো বিবৃতিতে আমরা স্বাক্ষর করিনি।

নেতাকর্মীদের আশা, দলের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে শিগগিরই জাতীয় পার্টির অস্বস্তি দূর হবে। রওশনের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এমপি জানান, আমরা রওশন এরশাদ এবং জি এম কাদেরকে সামনে নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই। ম্যাডামের (রওশন) এ বয়সে তো তার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। উনি চান সম্মান। তার সঙ্গে পরামর্শ করেই জি এম কাদের দল চালাবেন, এটাই ম্যাডামসহ সবার প্রত্যাশা।

পিডিএসও/হেলাল