খালেদা জিয়ার মুক্তির নতুন পথ খুঁজছে বিএনপি

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০৮:২৩

বদরুল আলম মজুমদার
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া

ঈদুল আযহার আগে জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় কারান্তরীণ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তি পেতে পারেন বলে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন মহলে বিষয়টি আলোচনাতেও এসেছিল। কিন্তু গত বুধবার হাইকোর্টে জামিন না হওয়ায় দলের হাইকমান্ড চেয়ারপারসনের মুক্তির নতুন পথ অনুসন্ধান করছে। কয়েক মাস আগে প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি সর্বাধিক বিবেচনায় ছিল এবং তাতে রাজিও ছিলেন চেয়ারপারসন নিজে। এ ছাড়া ঈদের আগে হাইকোর্টে তার জামিন আবেদন নাকচ হওয়ায় ভুল ভেঙে যায় নেতাদের। সে ক্ষেত্রে প্যারোলে মুক্তি, নাকি হাইকোর্টের জামিন আবেদন খারিজের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল, নাকি রাজপথে তীব্র আন্দোলনে যাবেন—সেই পথ অনুসন্ধান করছেন নেতারা।

দলের নেতারা বলছেন, বেগম জিয়ার মুক্তি রাজপথের দুর্বার আন্দোলন ছাড়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক কারণে বন্দি খালেদার মুক্তি রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা যে পর্যায়ে আছে, তা দিয়ে রাজপথে সংগ্রাম করে তাদের নেত্রীর মুক্তি সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হলে প্যারোলে আবেদন করতে হবে। নেতারা মনে করছেন, সরকারও চাচ্ছে প্যারোলে মুক্ত হয়ে খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিতে বিদেশে চলে যাক। এখন বিএনপি কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখতে অপেক্ষা ছাড়া আপাতত আর কোনো উপায় নেই।

এমন প্রেক্ষাপটে দলের একটি অংশ আবার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। তারা যেকোনো মূল্যে খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার পক্ষে। তাই প্যারোলে যেতে তাদের আপত্তি নেই। এ অবস্থায় সরকারের অনুকম্পা পেতে দলটি আপাতত গঠনমূলক রাজনীতি করছে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন সফরেও কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি রাখা হয়নি এবার। তবে দলের অন্য একটি অংশ মনে করছে, আদালতের সর্বশেষ অবস্থানের পর খালেদার মুক্তির সংকট আরো তীব্র হলো, পাশাপাশি সরকারের কট্টর অবস্থানের প্রকাশ ঘটল। সরকারের ইচ্ছা ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়ার জিহ্বায় আলসার হয়েছে। এক সপ্তাহে তার চার কেজি ওজন কমেছে। তিনি শুকিয়ে গেছেন। কিছুই খেতে পারছেন না। হুইলচেয়ার ছাড়া মুভ করতে পারছেন না। বিছানা থেকে একা একা উঠতে পারেন না। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে টয়লেটে, ওয়াসরুমে বা খাবার টেবিলে নিতে হয়। এভাবে বেগম জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মির্জা ফখরুল।

বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা মনে করছেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন হাইকোর্টে সরাসরি খারিজ হয়ে যাওয়ায় তার মুক্তির বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালাস চেয়ে যে আপিল আবেদন শুনানির অপেক্ষায় আছে, সেই আবেদনটি হাইকোর্টের অন্য কোনো বেঞ্চে উপস্থাপন করে জামিন আবেদন করা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় প্রক্রিয়া হলো হাইকোর্টের জামিন আবেদন খারিজের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়া। খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় এখন আপিল বিভাগে যেতে হবে। আমরা এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাব। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার জামিন হবে না। সাত বছরের সাজায় তার জামিন নামঞ্জুর করা অত্যন্ত দুঃখজনক।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ আলোচনা করে ঠিক করা হবে। খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী ও বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে যে শর্তগুলো আদালত বিবেচনা করেন, তার প্রত্যেকটি শর্তই বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। যেমন—স্বল্প সাজা, শারীরিকভাবে অসুস্থতা, বয়স ও সামাজিক অবস্থান। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ার হকদার। তারপরও তাকে জামিন না দিয়ে ন্যায়-বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, যেহেতু খালেদা জিয়ার কোনো আইনজীবীকে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না, তাই সিনিয়র আইনজীবীরা আলোচনায় বসে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন।

এদিকে গতকাল বিকেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বেগম জিয়ার মুক্তির ইস্যুটি প্রাধান্য পেয়েছিল। প্যারোলে তিনি মুক্ত হয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাবেন কি না—এ বিষয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেগম জিয়ার ইচ্ছার ওপর জোর দেয় স্থায়ী কমিটি।

পিডিএসও/হেলাল