এরশাদের অসিয়তনামা টিকবে কি না সংশয়

এরশাদ-পরবর্তী জাতীয় পার্টি

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯, ০৮:৩৫

বদরুল আলম মজুমদার

এরশাদের জীবদ্দশাতেই জাতীয় পার্টির নেতারা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিলেন। সর্বশেষ দলের হাল ধরা নিয়ে এরশাদের ভাই জি এম কাদের ও এরশাদের স্ত্রী রওশনের মধ্যে টানাপড়েন চলে এরশাদের মৃত্যুর প্রায় আগ পর্যন্ত। তবে জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, এরশাদ জীবিত থাকতেই তার দল ও পরিবারের উত্তরসূরির একটি ধারণা তিনি দিয়ে গেছেন। সম্পদও মোটা দাগে বণ্টন করে গেছেন।

এ অবস্থায় এরশাদের দেওয়া সেই ‘অসিয়তনামা’ বা প্রস্তাবনাগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে কি না তা নিয়ে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মনে এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে গতকাল এরশাদকে শেষ বিদায় দিতে আসা নেতারা এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন প্রতিবেদকের কাছে। তাদের আশা দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিভাবকের মৃত্যুর পর গৃহবিবাদ ভুলে পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারাটাই হবে বর্তমান নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। তবে জাতীয় পার্টির অপর একটি সূত্র বলছে, এরশাদের ভালো খারাপ সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেতাকর্মীরা আবেগ দিয়ে মেনে নিয়েছেন বা মানার মতো জায়গায় ছিলেন তিনি। তবে বর্তমান নেতৃত্ব দিয়ে এরশাদের সঙ্গে থাকা দেশের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা আর এই পার্টিতে সক্রিয় হন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমন চিন্তা মাথায় রেখে দলটির নিবেদিত নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টিকে এরশাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে শক্তভাবে ধরে রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। নেতাদের মুখেও এমন কথা উঠে আসে।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, আমরা চাই এরশাদের দেখানো পথে দলটি পরিচালিত হোক। শেষ পর্যন্ত তা হয় কি না এ নিয়ে এখনো কিছু বলার সময় আসেনি। কে হচ্ছেন সংসদের বিরোধী দলের নেতা এ বিষয়ে তিনি এখনই কথা বলতে রাজি হননি।

গতকাল জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সারা দেশ থেকেই দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছেন রাজধানীর কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এ সময় ‘বিবাদ’ ভুলে গিয়ে নিজেদের ‘ঐক্যকে’ দলের স্বার্থে জোরদারের কামনা করেন তারা।

এর আগে সকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক এই রাষ্ট্রপতির দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাদ আসর বায়তুল মোকাররমে তার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল সোমবার সকালে অনুষ্ঠিত সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই জানাজায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতারা অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন সংসদ সচিবালয় মসজিদের ইমাম আবু রায়হান। জানাজা শেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এরশাদের লাশে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মরহুমের লাশে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে সংসদের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপরই এরশাদের লাশ নিয়ে আসা হয় কাকরাইলের দলীয় কার্যালয়ে। সেখানেও সকাল থেকেই শত শত নেতাকর্মী জড়ো হন দলীয় চেয়ারম্যানকে শ্রদ্ধা জানাতে। এ সময় দলের নেতাকর্মীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা চোখের জলে প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

এরশাদকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা থেকে এসেছেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের স্যার আমাদের অভিভাবক ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের পিতার মতো। তাকে হারিয়ে আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছি। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় পার্টির প্রতিটি নেতাকর্মী স্যারের শেষ নির্দেশগুলো মেনে চলে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। আর আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে পরপারে স্যারের আত্মা শান্তি পাবে।

নোয়াখালীর জাতীয় পার্টির কর্মী শামসুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের স্যার সব সময় জাতীয় পার্টিকে সন্তানের মতো লালন করেছেন। জাতীয় পার্টি ও এর প্রতিটি কর্মী ছিল তার সন্তান। আজ তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। জাতীয় পার্টির এই কর্মী আরো বলেন, স্যার আমাদের সব সময় ঐকবদ্ধ রেখেছেন। আমরা আশা করি, আগামী দিনেও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা পল্লীবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ থেকে জাতীয় পার্টিকে এগিয়ে নেবে। এর আগে সকাল ১০টার কিছু পরে সাবেক রাষ্ট্রপতির লাশ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমঘর থেকে জাতীয় সংসদ ভবনে নিয়ে আসা হয়।

গত রোববার সকালে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মারা যান এইচ এম এরশাদ। গতকালই বাদ জোহর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কেন্দ্রীয় মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার লাশ সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হয়।

আশির দশকে সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে টানা আট বছর রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন এরশাদ। নব্বইয়ের দশকের শেষে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় নেন এই সামরিক শাসক। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি নানা রোগে ভুগছিলেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মারা যাওয়ার পর পরই দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা দলের পক্ষ থেকে সিএমএইচে গণমাধ্যমের কাছে এরশাদের ব্যাপারে পরবর্তী কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। এ সময় সেখানে জাতীয় পার্টির ঊর্ধ্বতন নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

কর্মসূচি অনুযায়ী রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নিয়ে যাওয়া হয় বায়তুল মোকাররমে। বাদ আসর সেখানে তার আরো একটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তার লাশ ফের সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হবে।

বৃষ্টি ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে গতকাল এরশাদের লাশ রংপুর নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি বলেন, (আজ) মঙ্গলবার হেলিকপ্টারে করে এরশাদের লাশ রংপুর নিয়ে যাওয়া হবে। বাদ জোহর রংপুর জেলা স্কুলের মাঠে এরশাদের শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানাজার স্থান পরিবর্তন হতে পারে বলেও জানান মহাসচিব।

মঙ্গলবারই এরশাদের লাশ ঢাকায় ফিরিয়ে এনে সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি আরো জানান, পর দিন অর্থাৎ বুধবার রাজধানীর গুলশানের আজাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে।

পিডিএসও/হেলাল