বিক্ষুব্ধ ঐক্যফ্রন্ট নেতারা

পরিধি বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলার প্রত্যয়

প্রকাশ | ১২ জুন ২০১৯, ১০:৩১

বদরুল আলম মজুমদার

জোটের সাত সংসদ সদস্যের শপথ নেওয়া ও সংসদে যোগ দেওয়া নিয়ে বিএনপির তৃণমূলে এবং শরিক দুই দলে চরম অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছে। এ নিয়ে কাদের সিদ্দিকীর জোট ছাড়ার আলটিমেটাম চলে যায় নীরবেই। এরই মাঝে কাদের সিদ্দিকীর ক্ষোভ নিরসনে জোট নেতারা বৈঠকে বসলেও নিজ সিদ্বান্তে অনড় বঙ্গবীর। আর এসব সংকটের মধ্যেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম বলছে, তাদের ঐক্য আরো সুসংহত হবে, জোটের পরিধি আরো বাড়ানো হবে। জোটের বৈঠক শেষে একই কথা বলেছেন জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রবও। তবে ক্ষোভ নিরসনের ঐ বৈঠকে অংশ নেননি নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না।

জোটের নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যাওয়া নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং নাগরিক ঐক্যের প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশে চরম অস্বস্তিতে আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপির মধ্যম সারির নেতারা ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া নিয়ে সিনিয়রদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে চলেছেন। এ ক্ষেত্রে ফ্রন্টের উদ্যোক্তা, প্রধান নেতাই এখন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। এমন অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের পরিধি বাড়ানো আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় রয়েছে। এ সংশয়ের মধ্যে ড. কামালের ঐক্যফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তারা বলছেন, আপাতত জোটের পরিধি না বাড়ালেও যুগপদ আন্দোলন সম্ভব, সেখানে সরকারের বাইরে থাকা অনেক দলকে পাশে পাওয়া যেতে পারে।

জোট নেতারা মনে করছেন, এখনই আন্দোলনে যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই জোটের প্রধান দল বিএনপি। দলটির সাংগঠনিক অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর যে, এই সংগঠন দিয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনা যাবে না। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, নতুন একটি নির্বাচনের দাবি আদায় করতে হলে দেশে সাধারণ মানুষকে মাঠে নামাতে হবে। কিন্তু মানুষ সরকারের বাইরের দলগুলোর ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে জনগণের কাছে যাব। জনগণের অধিকারহরণের বিষয়ে তাদের সতর্ক করতে পারলে, সফলতা যে আসবে না, তা নয়। কোনো কোনো দল এ মুহূর্তে ঐক্যফ্রন্টে আসবে, তা নিয়ে আগাম কিছু বলতে চাননি তিনি।

তবে মান্না এমন কথা বললেও ড. কামাল হোসেন বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভাঙছে না, ঐক্য আরো সুদৃঢ় করা হবে। এ বছরই আন্দোলন জোরদার করা হবে। জোটের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। বরং জোট সম্প্রসারণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা আর সব সমমনা সঙ্গে নেওয়া। কাজটা অব্যাহত আছে এবং আরো জোরদার করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জনগণের ঐক্য প্রয়োজন। সচেতন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য অপরিহার্য। ঐক্যফ্রন্ট ভাঙছে কি না—জানতে চাইলে কামাল বলেন, ‘মোটেই না। আমরা আগামী ১২ তারিখে বসছি আবার। আমাদের কথা হলো, আমরা বসে পুরো কৌশলটা ঠিক করে মাঠে নেমে যাই, ঐক্য আরো সুসংহত করি।’

এদিকে নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার যে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, সেই আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হয়েছে গত শনিবার। কিন্তু এখনিই ফ্রন্ট ছাড়ছেন না বঙ্গবীর। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরো সময় নিচ্ছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ৯ মে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার আলটিমেটাম দেওয়ার পর ড. কামাল হোসেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে বঙ্গবীরকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন ড. কামাল হোসেন। তিনি শরিকদের ক্ষোভ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

জোট নেতাদের ক্ষোভ নিরসনে গত সোমবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোকে নিয়ে আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায় বৈঠক করেন জোটের প্রধান নেতারা। সেখানে গণফোরামের দুজন এবং বিএনপির পাঁচজন প্রার্থীর শপথ নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন গণফোরামের পক্ষ থেকে নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ ও বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ঐক্যফ্রন্টের অস্বস্থির পরিপ্রেক্ষিতে নেতারা গত সোমবার প্রায় আড়াই ঘন্টা ব্যাপি বৈঠক করেও টানাপোড়েন কমাতে পারেননি। বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা বৈঠক হলেও নিজেদের মধ্যে কেবল আলোচনা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারা যায়নি। বৈঠক শেষে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র আ স ম আবদুর রব ব্রিফিংয়ে বলেছেন, বৈঠকে ড. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন না। তার অবর্তমানে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তাই বৈঠকটি আজকের মতো স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আবার বৈঠকে বসা হবে।

তিনি আরো বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত না করা পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এখনও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। ভবিষ্যতে বৃহৎ ঐক্য গড়ে তোলা হবে।

এদিকে বৈঠকের পর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমি আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম। এরইমধ্যে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে আমার। আশা করি খুব শিগগিরই আবারও বৈঠকে বসব। ড. কামালের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার পরই আমি আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাব। আমি যে আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম সে বিষয়ে অটল আছি।

উল্লেখ্য গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ তুলে শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রথমে গণফোরামের দুজন শপথ নেন। পরে শেষ মুহূর্তে বিএনপির পাঁচজনও শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। এ ঘটনায় গত ৯ মে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সাফ জানিয়ে দেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে সাতজনের শপথ গ্রহণের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে ৮ জুন ফ্রন্ট ছেড়ে দেবে তার দল।

 

পিডিএসও/হেলাল