জাপায় স্পষ্ট হচ্ছে বিভাজনরেখা

প্রকাশ | ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:০৫ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১০:০৪

বদরুল আলম মজুমদার
ছবি : সংগৃহীত

ঘন ঘন মত পরিবর্তন করে আলোচনায় আসা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন সকাল-বিকেল দলের নেতৃত্বেও পরিবর্তন করছেন। এর আগেও এ রকম করেছেন তিনি। এভাবে কথায় কথায় দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনায় খোদ দলের নেতাদের কাছেই বিরক্তির কারণ হয়ে পড়েছেন তিনি। একবার ভাইকে, আরেকবার স্ত্রীকে নেতৃত্বের আসনে রাখার ঘোষণা দিয়ে দলের বিভাজন স্পষ্ট করে তুলেছেন তিনি। এরশাদের শ্যাম রাখি না কুল রাখি—এমন পরিস্থিতিতে দলের অনেক নেতাই ব্যক্তিগত জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।

গত সংসদে রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা রাখলেও, এবার তাকে পদাবনতি ঘটিয়ে সংসদীয় উপনেতা করা হয়। এরশাদের পরিবর্তে জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও হওয়ার কথা ছিল তার, কিন্তু এক রাতেই সবকিছু উল্টে দেন এরশাদ।

শোনা যায়, এরশাদের এমন ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে দলের ডাকসাইটে নেতারা এখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে সাবেক দুই মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার এবং জিয়াউদ্দিন বাবলু এখন পরিবার পরিজন ও ব্যবসার কাজেই সময় ব্যয় করছেন। মাঝেমধ্যে এরশাদকে দেখতে যাওয়া ছাড়া কোনো মিটিং বা প্রোগ্রামে তেমন যাচ্ছেন না।

জি এম কাদের দলের নতুন কাণ্ডারি হলেও তার সঙ্গে দলের প্রভাবশালী একটি অংশের দূরত্ব কিছুতেই কমছে না। জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন, জি এম কাদের একজন ভদ্রলোক মানুষ, রাজনীতি খুব বেশি একটা বুঝেন না। যে যা বলেন তা তিনি বিশ্বাস করেন। ফলে সিনিয়র কোনো নেতা রাজনীতির বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

দেশজোড়া পরিচিতি আছে এমন ২০-২৫ জন নেতা রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী নন। তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, এসব নেতা সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। তারা সবাই রওশন এরশাদের নেতৃত্বে রাজনীতি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তারা যেকোনো সময় এরশাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সরিয়ে দিতে পারেন জি এম কাদেরকেও।

সূত্র আরো জানায়, তবে তাদের হাতে খুব বেশি সময়ও নেই। বয়সজনিত কারণে যেকোনো সময় এরশাদের অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে পারে। তখন রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া এরশাদের জন্য দুষ্কর হয়ে যেতে পারে। আর এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টিতে রওশনকে পুনর্বহাল করা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ নেতাকর্মীরা জি এম কাদেরের দিকে ঝুঁকে পড়বেন।

এদিকে এরশাদ-পরবর্তী জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে মূলত দুটি গ্রুপে বিভক্ত নেতারা। এক গ্রুপে রয়েছেন এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ, অন্যটিতে তার ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের। তা নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে চলছে রশি টানাটানি। আর এ অবস্থায় দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন। একবার রওশনের দিকে ঝুঁকলে পরক্ষণেই বলছেন জি এম কদেরই দলের ভবিষ্যৎ। এ জটিল দ্বন্দ্বে তিনি এখন কোনোভাবেই দলের ঐক্য ধরে রাখতে পারছেন না। দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার মতে, এরশাদের অনুপস্থিতিতে জাপা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যাবে। এখনই সেই ভাঙনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে বলেও দলটির সিনিয়র নেতারা মনে করেন।

একাধিক দলীয় সূত্র জানায়, এ বি এম রুহুল আমিনকে মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর দলের নেতৃত্বের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নিজের অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করার জন্য ছোট ভাই জি এম কাদেরকে মনোনীত করেন এরশাদ। তাকে আগাম মনোনয়ন দেওয়ায় যত আপত্তি রওশনপন্থিদের। এ অংশের নেতারা অনেকেই জি এম কাদেরের নেতৃত্ব মেনে নিতে নারাজ। প্রকাশ্যে না বললেও ভেতরে ভেতরে তারা রওশনকে চেয়ারম্যান করতে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন দলের চেয়ারম্যানকে। কাদেরকে অসহযোগিতা করছেন, সুযোগমতো তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেও ছাড়েন না তারা।

দল চালাতে ব্যর্থতা ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ২২ মার্চ গভীর রাতে জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেন পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ। পরদিন বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকেও বাদ দেওয়া হয় জি এম কাদেরকে। এতে পার্টির সিনিয়র নেতারা খুশি হলেও বেঁকে বসেন বৃহত্তর রংপুরের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে দলটির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এসে তার পাশে দাঁড়ান।

সে অবস্থায় দুই সপ্তাহ না পেরোতেই রংপুরের নেতাদের চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আবার কো-চেয়ারম্যানেরর দায়িত্ব দেওয়া হয় জি এম কাদেরকে। পরের দিন এরশাদ এক সাংগঠনিক নির্দেশে তার অনুপস্থিতিতে পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে জি এম কাদের থাকবেন বলে জানিয়েছেন এরশাদ। তার সর্বশেষ এই নির্দেশনা যেন আর কেউ পরিবর্তন করতে না পারেন, এ জন্য রংপুরের নেতারা এখন আরো বেশি সক্রিয়। এমন পরিস্থিতিতে জাপার সিনিয়র নেতারাও এরশাদের বাসভবন এড়িয়ে চলেছেন।

এদিকে, এরশাদের দ্রুত সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের বিষয়ে জাপার একজন সংসদ সদস্য বলেন, রংপুরের কয়েকজন নেতাকর্মী এরশাদকে অনেকটা জিম্মি করে জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদে পুনর্বহাল করতে বাধ্য করেছেন।

জাপার অন্য এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, দলটি সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয়েছে, সংসদে ২২টি আসন পেয়েছে সরকারের সমর্থনেই। কিন্তু জি এম কাদের এ বাস্তবতা মানতে চান না। তিনি পার্টি চালাতে কারো সহযোগিতাও চান না। এভাবে দল চলতে পারে না।

দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, জাতীয় পার্টি কোন দিকে যাচ্ছে, তা বলতে পারব না। জি এম কাদের দলের নেতৃত্ব দিলে দলটির ভবিষ্যৎ বলতে কিছু থাকবে না। তিনি রাজনৈতিক লোক নন। কারো সঙ্গে তার সমন্বয়ও নেই তার।

পিডিএসও/হেলাল