জামায়াত ছাড়ছে বিএনপি

কামালকে তুলাধুনা দলের ভেতরে

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯, ০৯:৫৮

বদরুল আলম মজুমদার

জামায়াতকে ২০ দলীয় জোট থেকে এখন বিদায় জানাতে রাজি না বিএনপি। ২০ দল থেকে জামায়াতকে বের করে দিলে দলটির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক চিরতরে খারাপ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিএনপির একাধিক নেতা। এছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা না বললেও বিএনপির ভেতরে এখন বিতর্কের কেন্দ্রে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। স্থায়ী কমিটির সর্ব শেষ বৈঠকে জামায়াত ছাড়ার প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি নেতারা। তবে ওই বৈঠকে অধিকাংশ নেতার পক্ষ থেকে মত এসেছে—আপাতত ২০ দল ভেঙে দিয়ে জামায়াতকে দূরে রাখা যায়। এ বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় ঘুরেফিরে এসেছে ড. কামাল হোসেনের কথা। তাকে তুলাধুনা করা হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, বিএনপির পক্ষে জামায়াতকে সরাসরি বাদ দিলে তার রাজনৈতিক ফায়দা সরকারের ঘরে যাবে। তাই আপাতত ২০ দল ভেঙে দিয়েই জামায়াতকে দূরে রাখার পক্ষে অধিকাংশ নেতা। ওই বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপিতে যুক্ত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য না দিয়ে সবার মতামত গ্রহণকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়েছেন।

অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে। এই প্রতিকূল অবস্থা উত্তরণে নানা ধরনের রাজনৈতিক ছক তৈরির চেষ্টা করছে দলটি। জোটকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বের হয়ে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নেতারা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের থেকে আপাতত বের হওয়ার পরিকল্পনা না করলেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জোট ২০ দলকে বিলুপ্ত করার ব্যাপারে ভাবছেন বিএনপি নেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামগ্রিক বিবেচনায় বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বেশির ভাগ নেতা বর্তমানে জামায়াত-বিচ্ছেদের পক্ষে। এত দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা না দেয়ার পক্ষে থাকলেও এখন ভিন্ন রকম ভাবনা শুরু হয়েছে। জামায়াতকে নিয়ে গড়ে তোলা ২০ দলীয় জোট কীভাবে বিলুপ্ত করা যায় সেসব বিষয় নিয়ে নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা হয়েছে।

গত বুধবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে জোট সঙ্গীদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জোট থাকা না থাকা নিয়ে। পাশাপাশি জামায়াতকে বিএনপি জোটে রাখা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। মিত্রের তালিকা থেকে জামায়াতকে বাদ দেয়ার বিষয়ে শীর্ষ নেতারা নিজেদের মতো করে বক্তব্য দিয়েছেন। আলোচনা হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নানা দুর্বলতার বিষয়েও।

সূত্র মতে, বৈঠকে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জামায়াতকে ২০ দলীয় জোটে রাখার বিরোধিতা করেন। বলেন, কয়েক বছর আগে যে বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে জোট করা হয়েছিল সেটি আর এখন নেই। এখন জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আন্দোলনেও তাদের পাশে পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় তাদের জোটে রেখে লাভ নেই। আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য তাকে সমর্থন করে বলেন, জামায়াত জোটে থাকুক অপর জোট সঙ্গীরাও চাচ্ছে না। ২০ দলীয় জোটের প্রয়োজন নেই বলেও মত আসে বৈঠকে। স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জামায়াত প্রসঙ্গে বৈঠকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। ২০ দলও তার হাতে গড়া। তার অনুপস্থিতিতে ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে। যদি ২০ দল বিলুপ্ত করা হয় তাহলে চেয়ারপারসনের মত নিয়েই করা হবে বলে সদস্যরা একমত হন। এছাড়া ২০ দল ভেঙে দিলে বা জামায়াতকে বাদ দিলে ক্ষমতাসীনরা বিএনপিবিরোধী নতুন কোনো কৌশল করে কি না তাও ভেবে দেখতে হবে বলেও বৈঠকে মত আসে।

এদিকে ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে বিএনপি নেতাদের তীর্যক মন্তব্যে ড. কামাল হোসেন ক্ষুব্ধ। এ বিষয়ে বিএনপি নেতাদের কাছে কারণ জানতে চলতি সপ্তাহেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক ডাকা হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কেউ এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। বুধবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান। তিনি বরাবরই জামায়াতের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি বলেন, জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে দলে আলোচনা চলছে। তবে সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, আমি বরাবরই জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে। কারণ জামায়াত বিএনপির জন্য বড় দায় হয়ে পড়েছে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আলোচনা থেকে জানা যায়, জামায়াত ছাড়তে হলে কীভাবে তা করা যায় এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, জামায়াতকে ২০ দলের বাইরে থাকার পরামর্শ দেওয়া উচিত। কারো মতে, পুরো জোটই ভেঙে দিতে হবে। ২০ দলের কোনো প্রয়োজনীয়তা এখন আর নেই। এর বাইরে ঐক্যফ্রন্ট থেকেও সরে আসার মত দেন একাধিক নেতা।

পিডিএসও/হেলাল