সংকটে বিএনপি : তরুণদের নিয়ে দল গোছানোর চিন্তা

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:২৪ | আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:২৮

বদরুল আলম মজুমদার

তরুণ ত্যাগীদের সামনে এনে দল গোছানোর চিন্তা ভাবনা করছে বিএনপি। প্রবীণ ও বর্তমানে ব্যর্থ নেতাদের সরিয়ে দলকে গতিশীল করার তাগিত এসেছে তৃণমূল থেকেও। গত কয়েকদিন থেকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এমন কথাই বলছেন জোরেশোরে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা নিয়ে দলটির ভেতরে বাইরে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিএনপির নীতি নির্ধারণী ফোরামের সদস্যদের নিয়েই মূলত এসব আলোচনা-সমালোচনা। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর ক্ষুব্ধ অনেকে। অনেক সিনিয়র নেতা এসব কারণে স্বেচ্ছায় পদও ছেড়ে যেতে চাচ্ছেন। আলোচনা আছে প্রবীণদের পাশাপাশি বেশি সংখ্যক তরুণদের দিয়ে নতুন করে দল সাজাতে। দলটির তৃণমূলেও নেতৃত্বের পরিবর্তনের জোর দাবি উঠেছে ঘরোয়া আলোচনায়।

দলের প্রধান কান্ডারি বিএনপি চেয়ারপারসন জেলে থাকায় দলটি এখন নেতৃত্বহীন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দেশে নেই। এ অবস্থায় দলের ভেতর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মহাসচিবসহ সিনিয়রদের কেউ কাউকে মানছেন না। সম্প্রতি এশাধিক বৈঠক ডেকেও নেতা বা প্রার্থীদের একত্র করতে পারেননি সিনিয়ররা। এমনকি নির্বাচনের পর প্রথম দুটি স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সিনিয়রদের সবাই উপস্থিত হননি। পরে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে সর্বশেষ বৈঠকে উপস্থিত হলেও দলের অভ্যন্তরীণ সংকট এখনো কাটেনি বলেই নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র।

সূত্র জানায়, সরকারের একতরফা আচরণের প্রতিবাদে একাদশ নির্বাচনে বর্জন করার জন্য ২৯৮ জনের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রার্থী বিএনপির সিনিয়র নেতাদের আবেদন জানালেও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থেকে যায় বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট। এ নিয়ে সারা দেশে প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত না পেলেও স্থানীয়ভাবে অনেকেই ভোট বর্জন করেন। এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুইজন প্রার্থীর সঙ্গে একান্তে কথা বললে তারা দুইজনই অভিন্ন সূরে জানান, নির্বাচন বর্জন করবে বিএনপি, শেষ পর্যন্ত মহাসচিবের এমন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা মনে করেছিলাম ২৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যাবে বিএনপি। কিন্তু সেটা যখন হয়নি, তারপর আশায় ছিলাম ভোটের দিন সকালেই হয়তো কেন্দ্রীয়ভাবে ভোট বর্জনের ঘোষণা আসতে পারে। সেটিও যখন আসেনি। পরে মাঠে থাকতে না পেরে নিজেরাই বর্জন করেছি। কারণ এমন নির্বাচন করে সরকারকে বৈধতা দেওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। এটি একটি বড় রাজনৈতিক ভুল। যে ভুলের মাশুল বিএনপিকে আর কতদিন দিতে হয়, তাই দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

এ ধরনের নানা আলোচনা-সমালোচনা এখন বিএনপি নেতাদের ঘরোয়া বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁয়িড়েছে। তারা বলছেন, দলের সব পর্যায়ে ব্যপক পরিবর্তন করে নতুনদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে বিএনপির নেতৃত্ব। বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, গত পাঁচ বছর আন্দোলন করব বলে মুখে ফেনা তুললেও একদিনের জন্য আন্দোলন হয়নি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আন্দোলন না করেও গায়েবি মামলা খেলাম, তাহলে আন্দোলন করতে সমস্যা কোথায় ছিল। যদি আন্দোলন হতো, তাহলে একটি পর্যায় হয়তো যাওয়া যেত। তার ওপর আরেকটি বিষয় হলো নির্বাচনের আগে ম্যাডামের মুক্তির বিষয়টিও সেভাবে সামনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। এসব দায় কি তৃমূল নিতে পারবে?

দলের ভেতর এমন সমালোচনার মুখেই দুইজন বয়োবৃদ্ধ সিনিয়র নেতা কাউন্সিল ডেকে বিএনপির নেতৃত্বের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা বলছেন, দলে যারা ব্যর্থ বলে পরিচিত হয়েছেন তাদের পদ ছেড়ে তরুণদের জন্য জায়গা করে দিতে হবে।

গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আলোচনা সভায় এ প্রস্তাব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদ। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ আলোচনা সভা করা হয়।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আমরা যারা ব্যর্থ বলে পরিচিত হয়েছি তাদের পদ ছেড়ে দিতে হবে। তরুণদের নেতৃত্বে আনতে হবে। তাহলেই ঘুরে দাঁড়াবে বিএনপি। তিনি আরো বলেন, কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে পরীক্ষিতদের সামনে আনতে হবে। যারা প্রার্থী ছিলেন তাদের নিজ নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের মামলা থেকে অব্যাহতির চেষ্টা ও জেল থেকে মুক্ত করাতে হবে। যেসব এলাকায় আমাদের প্রার্থী ছিল না সেখানে দলের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, দরকার হলে আমরা যারা, আমাদের বয়স হয়ে গেছে, আমরা সরে যাব। তারপরেও এ দলটাকে রাখতে হবে। তিনি বলেন, যারা দুঃসময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যারা দলের জন্য কাজ করেছেন, তাদের সামনের দিকে এনে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। এই কাজ আমাদের কয়েক মাসের মধ্যেই করতে হবে। তাহলেই ঘুরে দাঁড়াবে দল।

পিডিএসও/হেলাল