ঐক্যফ্রন্টে আবার জামায়াত ইস্যু : বিএনপিতে ক্ষোভ

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৫

বদরুল আলম মজুমদার
ama ami

নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, জামায়াতে ইসলামী বিএনপির টিকিট পাবে জানলে তিনি ঐক্যফ্রন্টের অংশ হতেন না। কিন্তু যদি এই ব্যক্তিগুলো ভবিষ্যতে সরকারে কোনো ধরনের ভূমিকা পালন করে, আমি এক দিনও থাকব না। এমন একটি বক্তব্যের সপ্তাহ-দুই পর এসে জামায়াত নিয়ে আবার কথা বলেছেন ড. কামাল হোসেন।

গত শনিবার গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পর দলটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের একটি লিখিত বক্তব্য দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে, তা সংশোধন করে ভবিষ্যতের জন্য সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এই বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেছেন, ‘আমরা অতীতে জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতির চিন্তাও করিনি। ভবিষ্যতেও পরিষ্কার যে, জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করব না।’ বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে বলবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি বলা যেতে পারে।’

দুই দফায় জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করা নিয়ে ড. কামালের এমন অবস্থান জোট রাজনীনিতে আবার নাটকীয়তার সূত্রপাত বলে অনেকেই মনে করছেন। বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের দলসহ স্বাধীনতার সপক্ষের বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অংশ নিয়েছিলেন। জামায়াতের সঙ্গে এক হয়ে রাজনীতি করা নিয়ে নির্বাচনের আগে ও পরে সরকার সমর্থক বিভিন্ন ব্যক্তি ব্যাপক সমালোচনা করেন ড. কামালের।

কিন্তু নির্বাচনী ভোটের মাঠে থাকায় বিএনপি এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। জামায়াতের ব্যাপারে বারবার এই ইস্যুগুলো উঠে এলেও বিএনপি বরাবরই চুপ থাকছে। দ্বিতীয়বারের মতো এবারও বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের ব্যাপারে ড. কামালের এ বক্তব্যের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। তবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ব্যক্তিপর্যায়ের আলোচনায় বিএনপির অধিকাংশ নেতা জামায়াতকে নয় বরং ড. কামালের দলকেই ছাড়ার ব্যাপারে মতো দিচ্ছেন।

জানা যায়, এমনিতে গত নির্বাচনে ড. কামালের ভূমিকা নিয়ে এরই মধ্যে বিএনপির তৃণমূল নেতারা বিভিন্নভাবে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে মূলত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন কি নাএমন জোর আলোচনাও চলছে বিএনপিতে। এ অবস্থায় জামায়াত নিয়ে আবার বক্তব্য দেওয়ায় বিষয়টিকে পরিকল্পিতই মনে করছেন দলের তৃণমূল নেতারা। এ নিয়ে নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপির প্রতিটি অঙ্গসংগঠনের নেতারা সামাজিক মাধ্যমে খোলামেলাভাবেই লিখছেন।

এদিকে জামায়াত নিয়ে ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যকে সঠিক উপলব্ধি বলে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। গতকাল তিনি বলেন, ‘আজকে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি একটি পক্ষ দেশ যাতে এগিয়ে না যায়, সে জন্য পেছন থেকে টেনে ধরার চেষ্টা করছে। আমি ড. কামাল হোসেন সাহেবকে ধন্যবাদ জানাই, গতকাল তিনি তার ভুলটি স্বীকার করেছেন। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করাটা ভুল ছিল। তিনি সেই ভুল উপলব্ধি করতে পেরেছেন।’

কামাল হোসেনের উক্তিতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীর তাৎক্ষণিক ধন্যবাদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে। তিনি দলের অনুমতি নেই বলে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দেখেন কেমন সোনায় সোহাগা মিল। ড. কামাল জামায়াত নিয়ে বললেন আর সঙ্গে সঙ্গেই ধন্যবাদ জানালেন বর্তমান সরকারের মন্ত্রী। নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে এমনিতে আমরা হাজার প্রশ্নবাণে জর্জরিত। তার ওপর জোটের শরিক নিয়ে কামাল সাহেবের বক্তব্যের কারণে তৃণমূলে আরো ভুল বার্তা যাবে। জামায়াত নিয়ে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। জামায়াত একটি নিবন্ধনহীন দল। তাদের কোনো মার্কা নেই। তারা নির্বাচন করারও যোগ্যতা হারিয়েছেন। যে কজন বিএনপির মার্কায় নির্বাচন করেছেন, তারা তো যুদ্ধাপরাধী নয়। আর জামায়াত নিয়ে এত কথার দরকার কী? দলটিকে নিষিদ্ধ করে দিলেই তো হয়। এটা নিয়ে সরকার রাজনীতি করবে আর আমরা সেই সুযোগ দেব, তা হয় না।

জামায়াতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল ও ২০-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান গণমাধ্যমকে বলেন, ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি নির্বাচনকালীন সময় বাংলাদেশে ছিলেন। মূলত নির্বাচনী মাঠে জামায়াতের কোনো প্রার্থী ছিলেন না। যারাই প্রার্থী ছিলেন সবাই বিএনপির। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। তারা অনিবন্ধিত দল হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আছে। আরপিও অনুযায়ী নির্বাচন করতে পারে না জামায়াত। জামায়াত নির্বাচন করেনি। যেসব ব্যক্তি নির্বাচন করেছেন, তারা বিএনপির সদস্য হিসেবে নির্বাচন করেছেন। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। ড. কামাল হোসেন যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত। আজকের নির্বাচনের ফলাফল যা হয়েছে, এটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ। একটা রাষ্ট্রীয় চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের হারানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আজ যেসব কারণ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, আমি মনে করি না এগুলো মূল কারণ। কেন না, আমরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি। আমি মনে করি, এটা পাতানো নির্বাচন, ষড়যন্ত্রের নির্বাচন। এটার বিরুদ্ধে যথাযথ কর্মসূচি নিয়ে আমাদের মাঠে নামা দরকার।

পিডিএসও/হেলাল