আসছে নির্বাচনী ইশতেহার

আ.লীগের লক্ষ্য নতুন ভোটার, গ্রামকে শহর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:২২ | আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:৫২

প্রতীক ইজাজ

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ। এই ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ যুবক। সংখ্যায় যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে আবার ২ কোটি নতুন ভোটার। এই তরুণ ও নতুন এবং গ্রামের ভোটারদের প্রতি লক্ষ রেখেই বিশেষ নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ইশতেহারের মূূল লক্ষ্য এসব ভোটারের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জীবন মানের উন্নয়ন ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। সে দিকটা লক্ষ রেখেই ‘গ্রাম হবে শহর এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’—এমন স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ইশতেহারে।

এ ছাড়া দেশের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ সালের প্রাধান্য থাকছে এবারের ইশতেহারে। সেই সঙ্গে থাকছে নতুন ভোটারদের কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার, মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর যে ৭৭ শতাংশ মানুষ গ্রামের; সেই জনগোষ্ঠীর সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি থাকছে ইশতেহারে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ঘোষণাও থাকবে ইশতেহারে। অবশ্য ইশতেহারের পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের বিগত সময়ের নানা দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের কথাও বলা হচ্ছে প্রচারণায়। প্রার্থীরা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। প্রচারণায় গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ, দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, অর্থ পাচারকারী, এতিমের টাকা আত্মসাৎকারী, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের কথাও।

ইশতেহার তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত দলের নেতারা জানান, ইশতেহারের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এখন সেটি দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। তিনি দেখছেন। আগামী ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার প্রকাশ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে আমরা যে অঙ্গীকারগুলো করেছিলাম, সেই অঙ্গীকারের প্রায় ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। আর কিছু কাজ চলমান। তা জনগণকে জানানো হবে। ইশতেহারে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমাদের অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট চিত্র থাকবে। আগামী ১০০ বছরে বাংলাদেশ কেমন হবে, এর একটা সুস্পষ্ট চিত্র থাকবে। এর বাইরে তরুণদের জন্য সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকবে।’

কী থাকছে ইশতেহারে : দলীয় সূত্রগুলো জানায়, তরুণ ভোটার আকৃষ্ট করতে দলের ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি থাকছে। এর মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকার ভাতা প্রদান, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো, আধুনিক নানা সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তার ঘোষণা উল্লেখযোগ্য। থাকছে নারীর ক্ষমতায়ন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে কঠোর অবস্থানের ঘোষণাও।

দলের শীর্ষ নেতারা জানান, গ্রামগুলোতে শহরের মতো নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণসহ নানা ঘোষণা থাকছে ইশতেহারে। এতে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রস্তাব যেমন থাকবে, তেমনি গত নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নাগরিকদের কাছে তুলে ধরা হবে।

এ ব্যাপারে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘গ্রামে নগর সুবিধা নিয়ে যেতে চাই। বিদ্যুৎ, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ আধুনিক জীবনযাপনের জন্য যা দরকার, তার ব্যবস্থা করতে চাই আমরা। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন আমাদের জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জ। দেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিল্প-কারখানা করা, যে বিনিয়োগে আমাদের তরুণ যুবকদের চাকরি হবে।’

এ ছাড়া সুশাসনকেও প্রাধান্য দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে এর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকছে ইশতেহারে। প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনীকে আরো আধুনিক ও জনহিতৈষী করে গড়ে তোলার কথা থাকবে। গত ১০ বছরে দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। এখন শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে—এমনটাই জানান দলের নেতারা।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ব্যাংক খাতে দুর্নীতি রোধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। জিডিপি, বিনিয়োগ কীভাবে বাড়ানো যায়, কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি কমানো যাবে; সে বিষয়গুলো থাকবে। ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা কী হবে এবং ইন্স্যুরেন্স কীভাবে ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। ব্লু ইকোনমি (সমুদ্র অর্থনীতি) অর্জনে ইশতেহারে দিকনির্দেশনা থাকবে। ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর বিশাল জলরাশি বাংলাদেশের হয়েছে। এ সমুদ্রসীমায় যে সম্পদ রয়েছে, সেটা কীভাবে আহরণ করে অর্থনৈতিক উন্নতি করা হবে, সে ব্যাপারে ঘোষণা থাকবে।

দলের শীর্ষ নেতারা আরো জানান, ভিশন-২০২১ ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আগামীতে লক্ষ্য, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। ইতোমধ্যেই ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে অগ্রসর করে নিয়ে তা গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হবে। গ্রামকে পরিণত করা হবে শহরে। ৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং আগামী ২১০০ সালে অর্থাৎ ৮০ বছর পর বাংলাদেশ কেমন হবে ইশতেহারে, সে ঘোষণা দেওয়া হবে। এর জন্য ১০০ বছরের ডেল্টাপ্ল্যান তুলে ধরা হবে ইশতেহারে।

প্রচারণা কৌশল : দলীয় সূত্রমতে, দেশের ৩০০ আসনে মহাজোটের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের সম্পৃক্ত করে এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত ভোট চাওয়ার লক্ষ্যে কমিটি গঠনের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এসব কমিটি প্রার্থীর নিজ এলাকায় সরকারের উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের ইশতেহারের নানা ঘোষণা প্রচার করবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার ব্যানার, পোস্টার, লিফলেটের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড ও অর্জন নিয়ে এবং বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরে ১৮টি ভিডিও প্রমো ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। যার মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে এসব প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, এবার উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি আগামী দিনের উন্নয়ন ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের চিত্র ও তাদের জ্বালাও-পোড়াওয়ের চিত্রও জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল