ভোটযুদ্ধে প্রার্থীরা মাঠে

নির্বাচনী প্রচারণায় সরগরম দেশ

প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:২৪ | আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:০১

প্রতীক ইজাজ ও বদরুল আলম মজুমদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কাক্সিক্ষত প্রতীক পেয়ে গতকাল থেকেই মাঠে নেমে গেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সৌভাগ্যবান প্রার্থীরা। গতকাল সকাল থেকেই প্রতীক বরাদ্দের পাশাপাশি শুরু হয় প্রার্থীদের প্রচারণা। দুপুরের মধ্যেই নানা প্রতীক ও প্রার্থীর ছবিসংবলিত সাদাকালো পোস্টারে ছেয়ে যায় গোটা দেশ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, আনাচে-কানাচে ঝুলতে থাকে প্রার্থীর ব্যানার। বদলে যায় চিরচেনা শহর, গ্রাম, পাড়া-মহল্লার চেহারা। প্রার্থীর পক্ষে মিছিল নামে রাস্তায়। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে চারদিক। মোড়ে মোড়ে দেখা যায় বিভিন্ন প্রতীক। তোরণ ওঠে। ভোটার ও সমর্থকরা মহাউৎসবে নেমে পড়েন প্রচারণায়। নির্বাচনী উৎসবে সাজে গোটা দেশ। মেতে ওঠে ভোটের আমেজে।

রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে প্রচারণা ঘোষণা দেয়। নিজ দলের নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেয় প্রচারণা কৌশল। দলগুলো ভোটারদের মন জয় করতে নির্বাচনী ইশতেহারের কথাও জানান প্রার্থী ও তার সমর্থকদের। সে অনুযায়ী প্রচারণা শুরু করেন প্রার্থীরা। কোথাও কোথাও প্রার্থীরা নিজেরাও গতকাল থেকেই রাস্তায় নেমেছেন প্রচারণায়। যাওয়া শুরু করেছেন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি, পাড়া-মহল্লায়। ছোট ছোট সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠকও শুরু করেছেন। রাস্তাঘাটে দুপুরের পর থেকেই পোস্টার সাঁটাতে দেখা গেছে। রাস্তাঘাটে, চায়ের স্টলে, আড্ডা-কাজে, চলতে-ফিরতে নির্বাচনী গল্প আলোচনায় মুখর হয়ে পড়েছে দেশ।

বিশেষ করে এবারও মূল ভোটযুদ্ধ হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মধ্যে। তাই এই দুই দলের প্রচারণার দিকেই মনোযোগ বেশি সবার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল বুধবার নিজ সংসদীয় আসন গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া) থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আগামী ১২ ডিসেম্বর (বুধবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে সড়কপথে যাত্রা করবেন। সেখানে পৌঁছে প্রথমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করবেন। এরপর টুঙ্গিপাড়ায় একটি জনসভায় বক্তৃতা করবেন। দুপুরে কোটালীপাড়ায় আরেক জনসভায় বক্তৃতা দেয়ার মধ্যে দিয়েই নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল থেকেই দলের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন। গতকাল রাজধানীর দলের চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে বেশকিছু নির্বাচনী অডিও ভিডিও সিডির মোড়ক উন্মোচন করেন।

রাজধানীর ডেমরা এলাকা জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবুল হোসেন বাবলা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে নির্বাচনী গণসংযোগে নেমেছেন গতকালই। এর বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মহাজোটের প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা করতে দেখা গেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনও গতকাল থেকেই নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে গেছেন। গতকাল তিনি দলের সবাইকে প্রচারণায় নামার আহ্বান জানান। সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা দেশের অধিকাংশ জেলায় নির্বাচনী জনসভা করবেন বলে জানা গেছে।

নির্বাচনকে ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। গতকালই নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারিক হাকিমদের (জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) উদ্দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা নির্বাচনী বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আপনারা সাংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করবেন। সুতরাং সাংবিধানিক দায়িত্ব ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে মূলত আজ থেকেই নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হয়ে গেল। বাকিটা মাঠে আপনাদের দায়িত্ব। আপনি স্বাধীন, আপনি নিরপেক্ষ, আপনি বিচারক, বিচারকের মাইন্ড আপনাকে অ্যাপ্লাই করতে হবে।’

জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সরব উপস্থিতি চায় কমিশন। কেউ শিথিলতা ও পক্ষপাতিত্ব করলে ১৯৯১ সালের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি বলেন, এবারের সংসদ নির্বাচনে একটাই স্বপ্ন, কোনো প্রার্থী যেন ভোটের মাধ্যমে নিজের জয় নিশ্চিত না করে জাতীয় সংসদে আসতে না পারেন।

তফসিল অনুসারে আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবার নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে প্রার্থী চূড়ান্তকরণ নিয়ে ঘাম ঝরিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে, জোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে নাটকীয় সব ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরই জোটে সমীকরণ পাল্টে যায়। জাতীয় পার্টি এরশাদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে সরকারি দলের মন কষাকষি এখনো চলছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শেষ মুহূর্তে সমঝোতা হলেও নানা কারণে অসন্তুষ্টি রয়ে গেল দলটিতে। এসব নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে নির্বাচন গড়িয়েছে মাঠে। প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। সকাল থেকে রাত অবধি শুরু হয়েছে গণসংযোগ। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়া শুরু করেছেন প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় নেতারা যাবেন আসনভিত্তিক গণসংযোগে।

এর আগে গত ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মোট ২ হাজার ৫৬৭টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৪৯৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।

দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৬৪টি আসনে ২৮১ জন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ২৯৫টি আসনে ৬৯৬ জন ও জাতীয় পার্টি ২১০টি আসনে ২৩৩ জন প্রার্থী দিয়েছিল।

২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে ২ হাজার ২৭৯টি মনোনয়নপত্র বৈধ ও ৭৮৬টি বাতিল ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ৫৪৩টি আপিল আবেদন জমা পড়ে।

বৃহস্পতিবার থেকে গত শনিবার তিন দিনে ইসি এই ৫৪৩টি আপিল আবেদনের শুনানি করে। এর মধ্যে ২৪৩টি আবেদন গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে ৩০০ জনের আবেদন খারিজ করে ইসি। এদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সাবেক মন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ইকবাল মাহমুদ টুকু, মীর নাসির উদ্দিন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী বাদে অধিকাংশ আলোচিত প্রার্থী ইসির আপিলে তাদের প্রার্থিতা ফিরে পান।

ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ২ হাজার ৫২২ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ১৮৫ জন। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।

এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ২৫৮ জন। এছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টি পাঁচটি, জাসদ তিনটি, তরিকত ফেডারেশন দুটি, বাংলাদেশ জাসদ একটি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ তিনটি আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন। পাশাপাশি বাইসাইকেল প্রতীকে জাতীয় পার্টি (জেপি) দুটি এবং লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টি ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে তিনটি আসনে আওয়ামী লীগ ও জোটের একাধিক প্রার্থী আছে, যারা সবাই মহাজোটের প্রার্থী। এই আসন তিনটি হলো কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৪ ও বরিশাল-৩। আর অবশিষ্ট ২৬টি আসনে নৌকা প্রতীকে কোনো প্রার্থী থাকবে না। এই ২৬টি আসনে লাঙ্গল প্রতীকে লড়বেন মহাজোটের প্রার্থীরা। গতকাল ইসিতে জমা দেওয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী তালিকা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া জাতীয় পার্টি মহাজোটের হয়ে ২৯টি আসনে লড়বে। এর বাইরে জাতীয় পার্টির আরো ১৩২ জন প্রার্থী ১৩২টি আসনে লড়বেন। তবে এরা মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে গণ্য হবেন না। এসব আসনে নৌকা ও লাঙ্গলের প্রার্থী থাকবেন। এই তালিকা গতকাল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দলের সূত্র।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ৫৮টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। ২৪২টি আসনে লড়বেন বিএনপির দলীয় প্রার্থীরা। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮টিতে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি ও শরিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন। অবশিষ্ট দুই আসনের মধ্যে একটিতে ২০ দলীয় জোটের নেতা ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ নির্বাচন করছেন নিজ দলের ‘ছাতা’ প্রতীকে। আরেকটি আসনে একজন লড়বেন স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে। গত রোববার নির্বাচন কমিশনের পাঠানো শরিকদের ও দলের মনোনয়নের পূর্ণাঙ্গ তালিকা থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামকে সাতটি, জেএসডিকে চারটি, নাগরিক ঐক্যকে চারটি এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পেল সর্বমোট ১৯টি আসন।

অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীকে ২২টি, এলডিপিকে পাঁচটি, খেলাফত মজলিশকে দুটি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে তিনটি, জাতীয় পার্টিকে (কাজী জাফর) দুটি, বিজেপি, কল্যাণ পার্টি, এনপিপি, লেবার পার্টি ও পিপিবিকে একটি করে আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। ফলে ২০ দলীয়জোট ৩৯টি আসন পেল।

তালিকায় উল্লিখিত প্রতীক বরাদ্দের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপিকে নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে এবারের নির্বাচনে লড়বেন। ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীরাও ধানের শীষ প্রতীকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে শুধু চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপির প্রধান অলি আহমেদ নিজের দলের ‘ছাতা’ প্রতীক ও কক্সবাজার-২ জামায়াতের হামিদুর রহমান আজাদ স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন।

১৪ দলীয় জোটের বাইরেও ৪ প্রার্থী থাকছে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ)। ওই পাঁচ প্রার্থী মশাল নিয়ে ভোটে থাকবেন। গতকাল ইসিতে পাঠানো চিঠিতে এ কথা জানিয়েছেন দলটির প্রধান হাসানুল হক ইনু। তারা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে শাহ জিকরুল আহমেদ, গাইবান্ধা-৩ আসনে এস এম খাদেমুল ইসলাম খুদি, রংপুর-২ আসনে কুমারেশ চন্দর রায় ও বরিশাল-৬ আসনে মো. মোহসীন। হাসানুল হক ইনু এই প্রার্থীদের মশাল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার জন্য ইসির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

আরেক চিঠিতে ১৪ দলীয় জোটের হয়ে তার দলের ৩ প্রার্থীর অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইনু। তাদের জন্য নৌকা প্রতীক বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছেন। তারা হলেন কুষ্টিয়া-২ আসনে হাসানুল হক ইনু, ফেনী-১ আসনে শিরীন আখতার ও বগুড়া-৪ আসনে এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন।

পিডিএসও/হেলাল