নেওয়া হচ্ছে বিশেষ কৌশল

বিদ্রোহী ঠেকাতে কঠোর আওয়ামী লীগ-বিএনপি

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৮, ১২:৫৬

প্রতীক ইজাজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুই দল থেকেই এবার মনোনয়নপ্রত্যাশীর যে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে; শেষ পর্যন্ত এ পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবেÑএ নিয়ে চিন্তিত দুই দলের নীতিনির্ধারকরা। তাই প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগেই ভবিষ্যৎ বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে দুই দলই। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রার্থী চূড়ান্ত করার পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থীদের দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। কে কোন আসন থেকে এবং কোন প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে অবিচল থাকতে পারেন, এমন তালিকাও করা হচ্ছে। দলীয় প্রার্থী ঘোষণার আগেই সবগুলো আসনেই একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবে দল। তার পরও যদি মনোনয়নবঞ্চিতদের কারো মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার মনোভাব বোঝা যায়, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলবেন। এর পরও যদি বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো না যায়, তাহলে দুদলই এসব প্রার্থীর ব্যাপারে দল থেকে আজীবন বহিষ্কারসহ নানা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।

নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে আসনপ্রতি মনোনয়ন চেয়েছেন গড়ে ১৪ জন করে। এর মধ্যে এগিয়ে বিএনপি। ধানের শীষে প্রার্থী হতে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ৪ হাজার ৫৮০ জন। অর্থাৎ প্রতি আসনের জন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৫ জন। অন্যদিকে নৌকার প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ৩ হাজার ৬২৮ জন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ থেকে আসনপ্রতি মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৩ জন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দুদলেই দলীয় হেভিওয়েট প্রার্থী যেমন রয়েছেন; তেমনি মাঠের রাজনীতিতে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর সংখ্যাও কম নয়। আবার ভোটে জিততে পারেনÑএমন প্রার্থী রয়েছেন জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও। কোন নির্বাচনী আসনে ৫২ জন পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশীর খবর পাওয়া গেছে। এমনকি এবার দেশের নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রায় অর্ধেকই নিজেদের নির্বাচনী প্রতীক তুলে রেখে শামিল হয়েছে আওয়ামী লীগের নৌকা ও বিএনপির ধানের শীষের পতাকা তলে।

আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই হুশিয়ার করে দিয়েছেন, নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে তাকে আজীবনের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। এমনকি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হলে ‘খবর’ আছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। একইভাবে বিএনপি থেকে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া যাবে না বলে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। দুই দলের নেতারা মনে করছেন, এবার নির্বাচন তাদের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়েছে। সবাই সংসদ সদস্য হতে চাইছেন। সবাই নির্বাচনে বিজয়ী হবেন বলেও মনে করছেন। অন্যদিকে, গতবার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এবার বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলেও মনে করছেন দলের নেতারা। অথচ সে অনুপাতে এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব নয় দুদলেরই। কারণ হিসেবে দলের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগকে এবার ১৪ দলীয় জোটের শরিক ও যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় পার্টিসহ মহাজোটের শরিক দলগুলোকেও সামাল দিতে হচ্ছে। অনুরূপভাবে বিএনপিকেও ২০ দলীয় জোটের শরিক ও জোটে নতুন যুক্ত হওয়া আরো তিনটি দল, নিবন্ধন হারানোয় আলাদাভাবে জামায়াতে ইসলামীকে এবং বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন চাপ সামাল দিতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে এবার দুদলেই বিদ্রোহী প্রার্থী দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতারা বলছেন, জোটকে সামাল দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দলের অনেকে মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন। এর মধ্যে অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও রয়েছেন বলে জানা গেছে।

দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করবে আওয়ামী লীগ : বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে আগেভাগেই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। গত ২৬ অক্টোবর শুক্রবার বিদ্রোহীদের ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণে গণভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা স্পষ্ট হুশিয়ারি করে দিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো নেতাকর্মী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তাকে আজীবন বহিষ্কার করা হবে। সর্বশেষ গত ১৪ নভেম্বর গণভবনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকালে তিনি আবার একইভাবে হুশিয়ার করে দেন। তিনি এত বেশিসংখ্যক মনোনয়নপত্র বিক্রি হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তৃণমূল যে নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছে, তা এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেছে। যেসব আসনে মনোনয়নপত্র বেশি কেনা হয়েছে, সেখানে নেতৃত্বশূন্যতা রয়েছে। সেখানে যত বড় নেতাই হোক না কেন, তারা পার্টিকে অর্গানাইজ করতে পারে নাই। এটা তাদের নেতৃত্বশূন্যতার প্রমাণ। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ক্ষমতায় এলে অনেক পদ সৃষ্টি করে সেখানে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

মনোনয়নের ব্যাপারে শেখ হাসিনা বলেন, জরিপে যাদের জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরিপ চালানো হয়েছে। জরিপের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করা হলে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে। একটা সিটও হারাবÑকারো এমন মনোভাব পোষণ করা যাবে না।

দলীয় সূত্র মতে, গণভবনে নেতাদের ডেকে নিয়ে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এখন পর্যন্ত কাউকেই কোনো আসনেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে কোনো রকম সংকেত বা সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি। কাউকে প্রার্থী হিসেবে কাজও করতে বলা হয়নি। ফলে এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে দল থেকে যাকেই প্রার্থী করা হবে, তার পক্ষেই সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রার্থী কে হলেন, সেটি দেখা যাবে না, নৌকা প্রতীক দেখে ভোট দিতে হবে। এর পরও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে, তিনি যত বড় নেতাই হন না কেন, সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে।

এর আগে নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশ কয়েকজন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচন করেন। তাদের মধ্যে যারা নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন, তাদের দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেসব নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন উল্লেখ করে দলের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। নির্বাচনে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। ফলে এবার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে পার পাবেনÑএমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

এ ব্যাপারে দলের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী এবার কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলে অতীতের মতো এবার আর ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও বেশ কয়েকটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। ওইসব কমিটি সার্বিকভাবে নির্বাচন কর্মকা- পরিচালনা ও দেখভাল করবে।

বুঝিয়ে ঠেকাতে চায় বিএনপি : দল থেকে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য নেতাকর্মীদের এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর জন্য সব মনোনয়নপ্রত্যাশীর ইতিবাচক মতামতও গ্রহণ করছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা। এমনই জানিয়েছেন দলের কয়েকজন নেতা।

দলীয় সূত্র মতে, গত সোমবার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারে দলের হাইকমান্ড বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন মামলায় কারাদ-প্রাপ্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের নীতিনির্ধারক নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া চলবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশ দেন।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, কৌশলে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে চায় দলটি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নির্দেশনা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। তাদের বলা হয়েছে, এই নির্বাচনকে সংকট থেকে উত্তরণের নির্বাচন হিসেবে গ্রহণ করতে। সেই বিবেচনা করে দল যাকে মনোনয়ন দেয়, তার জন্য সবার কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দল প্রার্থীদের নিয়ে জরিপ করেছে। কোন এলাকায় বিএনপির কোন প্রার্থী জনপ্রিয়, সেই তালিকা নীতিনির্ধারকদের হাতে রয়েছে।

এ জন্য দল বেশ কয়েকটি কৌশল নিয়েছে বলে জানান নেতারা। তারা বলেন, একটি আসনের সব মনোনয়নপ্রত্যাশীকে ডেকে একসঙ্গে কথা বলে মনোনয়ন চূড়ান্ত করা, নির্বাচনকে দলের সংকট উত্তরণের একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরা, স্থানীয় জরিপে কার কী অবস্থান তা তুলে ধরা এবং দলের চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার নির্দেশ জানিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ব্যাপারে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, প্রত্যেক আসনে প্রথম চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে বসা হবে। আমরা যদি একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত দিই, তাহলে আশা করি বিদ্রোহী প্রার্থী কেউ হবেন না।

পিডিএসও/রিহাব