আসনপ্রতি আবেদনকারী গড়ে ১৪

আ.লীগ-বিএনপিতে প্রার্থীর চাপ

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৭ | আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৮, ১২:১৩

প্রতীক ইজাজ ও বদরুল আলম মজুমদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী চাপে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে এই চাপ সামাল দিতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। একদিকে যেমন এই দুই দলের দলীয় প্রার্থীদের চাপ; অন্যদিকে তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোর চাপও। দলীয় প্রতীকে জোটগত নির্বাচন করতে গিয়ে অন্য যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় এবার এই চাপ বেশ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এই দুই দলের জন্যই।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল এবং জাতীয় পার্টি ও যুক্তফ্রন্টসহ সমমনা দলগুলোর প্রার্থীর সামাল দিতে হচ্ছে। তেমনি দলীয় প্রার্থীকে আমলে নিয়ে ২০ দলীয় জোটের শরিক ও পরে যুক্ত হওয়া আরো তিনটি দল এবং সর্বশেষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি। অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে প্রতি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৩ জন। এর চেয়ে এগিয়ে বিএনপি। সেখানে প্রতি আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ১৫ জন। এর মধ্যে দুই দলেরই দলীয় হেভিওয়েট প্রার্থী যেমন রয়েছেন; তেমনি মাঠের রাজনীতিতে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর সংখ্যাও কম নয়। আবার ভোটে জিততে পারে—এমন প্রার্থী রয়েছেন জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও। কোনো কোনো নির্বাচনী আসনে ৫২ জন পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী খবর পাওয়া গেছে।

এমনকি এবার দেশের নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রায় অর্ধেকই নিজেদের নির্বাচনী প্রতীক তুলে রেখে শামিল হয়েছে আওয়ামী লীগের নৌকা ও বিএনপির ধানের শীষের পতাকা তলে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই বলছে, তাদের প্র্রার্থী চূড়ান্ত। এখন চলছে জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার কাজ। সমঝোতা শেষে প্রয়োজন হলে চূড়ান্ত তালিকা থেকেও বাদ পড়তে পারেন অনেক প্রার্থী। এ নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। চলছে প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঢাকায় অবস্থান করছেন। দলীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি নিয়মিত যোগাযোগ করছেন দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও। যদিও দলের হাইকমান্ড থেকে এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া প্রার্থীদের ফোন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু উদ্বেগ কাটছে না। শেষ মুহূর্তে কি হয়- সে ভাবনায় পেয়ে বসেছে তাদের।

নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই দলগুলোকে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে। নিশ্চিত মনোনয়ন নিয়ে ১০ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন প্রার্থীরা। কিন্তু কীভাবে প্রার্থীর বিশাল চাপ সামাল দেয় দল দুইটি—এখন সেটিই দেখার বিষয়। আর কেমন প্রার্থী হলো, তার শেষ ফল মিলবে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের মধ্য দিয়েও। এমনকি মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর বোঝা যাবে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলগুলোর সিদ্ধান্ত কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে। কেননা প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত মনঃপূত না হলে বিদ্রোহী প্রার্থী দেখা দিতে পারে।

এ ব্যাপারে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, দলীয় প্রার্থী প্রায় ঠিক করে ফেলা হয়েছে। এখন জোটের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাদের কারা কারা প্রার্থী হতে চান, সেই তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা পেলে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বসা হতে পারে। তিনি বলেন, চূড়ান্তভাবে জোটের সমীকরণ যেখানে দাঁড়াবে, সে অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। এ জন্য চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা প্রার্থী চূড়ান্ত করব আরো পরে। কারণ আমাদের জোটের দলগুলো আছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আরপিও অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহারের চূড়ান্ত দিনে হয়তো মনোনয়ন দিতে হবে। পুরো ব্যাপারটা চ্যালেঞ্জিং হলেও খুব কঠিন হবে না।

এক আসনে গড়ে ১৩ প্রার্থী আওয়ামী লীগের : এবার ৩০০ সংসদীয় আসনে ৪ হাজার ২৩ জন প্রার্থী আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে গড়ে ১৩ জন প্রার্থী নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী।

এর মধ্যে বরগুনা-১ আসনের জন্য দলের ৫২ জন সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এটিই এবার ক্ষমতাসীন দলের একক কোনো আসনে সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার ঘটনা। এক আসনের হিসেবে দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি রেকর্ড বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার সাতটি আসনে একক প্রার্থী হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া) আসনে দলের একক প্রার্থী হয়েছেন শেখ হাসিনা।

প্রার্থীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে দলের মনোনয়ন তালিকা থেকে এবার বাদ পড়ছেন অনেকেই—এমন কথা শোনা যাচ্ছে। কারা বাদ পড়ছেন এ নিয়ে আলোচনা দলের সর্বত্র। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত হতে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সংসদীয় বোর্ডের সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসা-অফিসে ভিড় করা অব্যাহত রেখেছেন।

বাদ পড়ার পেছনে কারণ হিসেবে যেসব বিষয় এসেছে সেগুলো হচ্ছে জনপ্রিয়তা হারানো ও দলীয় কোন্দল। আবার জোট-মহাজোটের সমীকরণে পড়ে কারো কারো কপাল পুড়ছে বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানিয়েছে। এসব সূত্র মতে, যেসব আসনে বর্তমান সংসদ সদস্যরা বাদ পড়তে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে, সেসব আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনেকেই কেন্দ্র থেকে সবুজ সংকেট পাওয়ার দাবি করেছেন।

দলীয় সূত্র মতে, প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পর্যন্ত দুইটি বৈঠক হয়েছে দলের সংসদীয় বোর্ডের। কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে গণভবনে প্রায় প্রতিদিনই বসছেন বোর্ডের সদস্যরা। দল ৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এখন এসব প্রার্থীর মধ্য থেকে জোট ও মিত্রদের আসন চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। এমন ২০০ আসনে প্রার্থী নিশ্চিত হয়ে গেছে। ৪০-৫০ জন বাদের তালিকায় আছেন। কিছু আসনে একাধিক প্রার্থীর নাম রাখা হয়েছে। জোট ও মিত্রদের জন্য কোন কোন আসন ছেড়ে দেওয়া হবে, সেটা নিয়ে কাজ চলছে। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী কারা বাদ পড়ছেন, কারা নতুন আসছেন, তা গত রাতেই চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, এবার জোটের শরিকদের ৬৫ থেকে ৭০টির মতো আসন দেওয়া হতে পারে। তবে এর মধ্যে আলাপ-আলোচনা এবং জরিপ অনুযায়ী জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী যদি বেশি হয় তাহলে বেশি দেওয়া হবে। আর কম থাকলে তাও বিবেচনা করা হবে। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা জয়ী হওয়ার মতো নন, দল তাদের বাদ দিতেও দ্বিধা করবে না। দলের সূত্রগুলো আরো জানায়, জরিপ অনুযায়ী যারা এগিয়ে আছেন, তাদের মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এবারের মনোনয়ন তালিকায় নবীন প্রবীণ থাকছে বলেও জানান দলের নীতিনির্ধারকরা।

এক আসনে বিএনপির ১৫ প্রার্থী : এবার নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি। মনোনয়নপ্রত্যাশীর এই বিপুল সংখ্যা দলের হাইকমান্ডকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। এবার প্রতি আসনে গড়ে প্রায় ১৫ জনের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে চান। এ সংখ্যা সামনে রেখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ সিনিয়র নেতারা সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন প্রার্থীদের।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, দলীয় প্রার্থীদের নিয়ে বিএনপিকে তেমন ঝামেলায় পড়তে হবে না। দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সবাই থাকবে এমন নিশ্চয়তা বেশি পাচ্ছেন নেতারা। বিদ্রোহীর ঝামেলা দলটিতে খুব বেশি হবে বলে মনে করেন না দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। তবে তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে শরিকদের আসন বণ্টন করা নিয়ে। বিএনপির পক্ষ থেকে ৭০-৭৫টি আসনে শরিকদের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও জোটভুক্ত দলগুলোর চাহিদা বিবেচনায় নিলে সেই সংখ্যা ১০০ ওপরে যেতে পারে। এমনটা হলে বিএনপির অনেক জনপ্রিয় সাবেক এমপি মনোনয়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

অন্যদিকে শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিজ দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও দলের নেতারা ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জামায়াত ধানের শীষ না কি স্বতন্ত্র কোনো প্রতীক নেবে সেটিও দেখার বিষয়। তবে জোটগত নির্বাচন করার জন্য দলের পক্ষ থেকে ৫১টি আসন চাওয়া হয়েছে। আর বিএনপি জামায়াতের ১৬ জন সাবেক এমপিকে এবার মনোনয়ন দেবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।

দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, জোটের শরিকদের মধ্যে কেউ যদি অধিক যোগ্য হন তবে তাকে মনোনয়ন দিতেও আপত্তি থাকবে না বলে দলগুলোকে জানানো হয়েছে। জোটের সব দলই বিএনপির কাছে একটি প্রাথমিক তালিকা জমা দিয়েছে। এ নিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা চলমান আছে। ২০ দলীয় জোটের শরিক ও ঐক্যফ্রন্ট মিলে প্রায় দুই শতাধিক আসনের চাহিদার কথা জানিয়েছে বিএনপিকে। তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আরো সময় নিতে চায় বিএনপি।

এ ব্যাপারে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা এর আগেও জোটগতভাবে নির্বাচন করেছি। আমরা একটা বিষয়ে সবাই একমত—যে প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি তাকে মনোনয়ন দেয়া হবে। সেই প্রার্থী বিএনপির হোক কিংবা শরিক দলের। এক্ষেত্রে ছোট একটা দলের যদি বেশি যোগ্য প্রার্থী থাকে তারা মনোনয়ন পাবেন। বিপরীতে বড় কোনো দল থেকে সম্ভাবনা কম থাকলে প্রার্থীও কম দেয়া হবে।

পিডিএসও/হেলাল