নির্বাচনী ইশতেহার

২ জোটের টার্গেট তরুণ ভোটার

নির্বাচন বেশ কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে, এমনই আভাস মিলছে

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৪১

প্রতীক ইজাজ

নির্বাচন কমিশনের পুনঃতফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে হিসেবে ভোটের বাকি দেড় মাসেরও কম। ইতোমধ্যেই নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নেমেছে সব রাজনৈতিক দল। শরিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এবার নির্বাচন বেশ কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে, এমনই আভাস মিলছে দলগুলোর নির্বাচনী প্রস্তুতি দেখে। ফলে সব দলেরই মূল লক্ষ্য মাঠের ভোটার; ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ। সে লক্ষ্যে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে এখন দলগুলো ব্যস্ত নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতে। দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর আগামী ১০ ডিসেম্বর থেকে এই ইশতেহার নিয়েই আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারে নামবেন প্রার্থীরা। জমে উঠবে ভোটের মাঠ। চেষ্টা থাকবে ভোটার টানার।

ইতোমধ্যেই নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করে ফেলেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। চলছে শেষ মুহূর্তের ঘষামাজা। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ‘দিনবদলের সনদ’ ও ২০১৪ সালের ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’-এর মতো একাদশ এই নির্বাচনেও জাতিকে নতুন চমক দিতে চায়। সে লক্ষ্যে ইশতেহার তৈরি হয়েছে দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের ঘোষণাপত্রের আলোকে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন ইশতেহার প্রণয়ন কমিটিতে রয়েছেন দল ও দলের বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশিষ্টজনরা। এবারের ইশতেহারে ‘সমৃদ্ধির বাংলাদেশ’ শিরোনামকে প্রাধান্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘দিন বদল শুরু করেছি, দিন বদল এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’

এ ব্যাপারে ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা আমাদের একটি গাইড লাইন দিয়েছিলেন। আমরা দলের নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নিয়েছি। টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টিকর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত, দুর্নীতি-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার নতুন চমক দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে এবারের ইশতেহার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এখন শেষমুহূর্তের কাজ চলছে।

অন্যদিকে, বিএনপি এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তভাবে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ১১ লক্ষ্য এবং বিএনপির ভিশন-২০৩০ সামনে রেখেই এই ইশতেহার। এর আগে নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিএনপির নীতি নির্ধারকরা একটি খসড়া তৈরি করেছিলেন। এখন ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই ফ্রন্টের ১১ লক্ষ্যকে যুক্ত করে নতুন ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। এ জন্য ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি করা হয়েছে। ইশতেহারের খসড়া প্রণয়ন কমিটিতে সব শরিক দলের প্রতিনিধি রয়েছেন। সেসব দলের লক্ষ্যগুলোও ইশতেহারের খসড়ায় সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নীতি নির্ধারকরা।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ঐক্যফ্রন্টের ১১ লক্ষ্য ও বিএনপির চেয়ারপারসন ঘোষিত ভিশন-২০৩০ সামনে রেখে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে। এ নিয়ে ইশতেহার প্রণয়ন কমিটি কাজ করছে। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট অবশ্যই দেশের মানুষকে কাছে টানার মতো করেই ইশতেহার প্রকাশ করবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় নীতিনির্ধারক এবং এই দুই দলের নেতৃত্বাধীন জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনী ইশতেহার সম্পর্কে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য উন্নত বাংলাদেশ গড়া ও জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন : মূলত এই দুই প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার করছে আওয়ামী লীগ। ইশতেহারে এবার নির্বাচিত হলে আগামী ৫ বছর তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ তৈরিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা জানান, এবারের ইশতেহারে একুশ শতকের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের চিত্র থাকবে। তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো হলো—গত পাঁচ বছরের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চিত্র, আগামী পাঁচ বছরে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং একুশ শতক পর্যন্ত বাংলাদেশ কেমন হবে, তার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। ইশতেহারে তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ গঠনে দক্ষ জনশক্তি গড়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির নেতারা জানান, ইশতেহারে জাতিকে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাবে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে থাকবে ২০৪১ নয়, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার অঙ্গীকার। অর্জন ও ব্যর্থতার পাশাপাশি শুধরে নেওয়ার লক্ষ্যে তুলে ধরা হবে ভুলগুলোও। জানা গেছে, দেশের উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য ১০ অগ্রাধিকারের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক ২১টি খাতে চলমান অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হবে ইশতেহারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবিষ্যৎ করণীয়ও স্পষ্ট করা হবে। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবারের ফোকাস পয়েন্টে রাখা হবে। পিছিয়ে পড়া নারী এবং চরাঞ্চলের মানুষের জন্য ঘোষণা করা হবে নতুন অঙ্গীকার।

আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কোচেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম গণমাধ্যমকে জানান, দেড় কোটি নতুন ভোটারের জন্য নতুন সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সমাধানপথ থাকবে আগামী ইশতেহারে। ‘তারুণ্যই শক্তি’ সেøাগান ধারণ করে নতুন ভোটারদের বান্ধব হবে এবারের নির্বাচনী ইশতেহার। এ ছাড়া ইশতেহারে থাকবে কওমি মাদরাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, কৃষিবান্ধব শিল্প গড়ে তোলা, ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চমক।

এ ব্যাপারে ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ইশতেহারে একুশ সাল পর্যন্ত ডেল্টা প্ল্যানের কথা তুলে ধরা হলেও প্রাধান্য পাবে আগামী পাঁচ বছরের প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের ইশতেহার ঘোষণা করবেন।

সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জোর বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের : ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিএনপি এবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্তভাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে। নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্য নিয়েই ইশতেহার তৈরি করতে সমন্বিতভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জোটের একাধিক নেতা জানান, বিএনপি ইতোমধ্যেই ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেছে। এই ভিশনকে সামনে রেখেই ইশতেহার প্রণয়ন হচ্ছে। এ ছাড়া, আরো বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে মানুষের সামনে একটি দায়িত্বশীল ও তরুণদের আগ্রহী করে তোলে, এমন ইশতেহারই ফ্রন্টের লক্ষ্য বলে জানান তারা।

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটি সদস্যরা জানান, এবার ক্ষমতায় এলে সংসদ ভেঙে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার’ ব্যবস্থা চালু করা হবে। ইশতেহারে আরো যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা থাকছে, সেগুলো হলো—রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা। এ ছাড়া প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণসহ তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে থাকবে বেশ কিছু চমক। কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে পাঁচ থেকে ১০ ভাগ করবে এই জোট।

সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আগামী নির্বাচনী ইশতেহারে থাকছে ‘নতুন ধারা’র পূর্ণাঙ্গ ধারণা। সরকার, সংসদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতিসহ সরকারের প্রতিটি বিভাগে নতুন ধারার আলোকে পরিকল্পনাগুলো সন্নিবেশিত করা হচ্ছে। মেধার পরিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে চাকরিতে কোটা পদ্ধতি কমিয়ে আনা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগে দলীয়করণের অবসান ঘটিয়ে মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকবে।

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা আরো জানান, তরুণদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি ইশতেহারকে যুগোপযোগী করার পরিকল্পনা আছে। বিশ্বায়নের নানাদিক তুলে ধরার পাশাপাশি তরুণ ও নারীদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ থাকছে ইশতেহারে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিকে। ইশতেহারে প্রতিহিংসা নয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে নতুন ধারার রাজনীতির। এসব বিষয়ে ভিশনেও কিছু তথ্য তুলে ধরেছে বিএনপি।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ঘোষিত ১১ দফা লক্ষ্য ও বিএনপির ভিশন ২০৩০-এর আলোকে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। ইশতেহারে দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বিষয় থাকবে।

পিডিএসও/হেলাল