আসন নিয়ে শরিকদের চাপে বিএনপি

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৫৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোট ছাড়াও ঐক্যফ্রন্টও ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় এই চাপ আরো বেড়েছে। সূত্র জানায়, ২০ দল এবং ঐক্যফ্রন্টের নেতারা চাহিদা দিয়েছেন প্রায় ২০০ শতাধিক আসনের। বিএনপি তাদের সর্বোচ্চ ৭০টি আসনে ছাড় দিতে চায়। বিএনপির এমন অবস্থানের মুখে দুই জোট ১৫০ আসনের ব্যাপারে অনড় থাকছে। এ পরিস্থিতিতে নিজ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ৩০০ আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে এখন মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তদবির ও লবিং সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দলটির হাইকমান্ড।

এ বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জোটের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে এখনো বৈঠক হয়নি। শিগগিরই ২০ দল এবং ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, যোগ্য ও বিজয়ী হওয়ার মতো শক্তিশালী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলো বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। অন্যদের বেলায় গুরুত্ব পাবে দল ও ব্যক্তিগত ভোটব্যাংকের হিসাব। এদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে নিজ দল ও ঐক্যফ্রন্টের আসন বণ্টনের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী করা হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে। আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হলেও এরই মধ্যে তারা হোমওয়ার্ক শুরু করেছেন।

সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এত দিন ১০০ আসন চাওয়ার কথা ভাবছিল। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের কাছে বিজয়ী হওয়ার মতো সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির কাছে ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম ১৫, জেএসডি ১৫, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ১০ ও নাগরিক ঐক্য ১০টি আসন চাইবে। দাবি ৫০ আসন হলেও তাদের সর্বোচ্চ ১৫টি আসন দিতে চায় বিএনপি। অবশ্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলে আরো কয়েকটি আসন দেওয়া হবে।

গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন নির্বাচন করতে রাজি নন। তবে দল ও জোট শরিকদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ঢাকা-৮ বা অন্য এক বা একাধিক আসনে প্রার্থী হতে পারেন তিনি। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু ঢাকা-২ বা ৩ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ঢাকা-১৪ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। ডাকসুর সাবেক ভিপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ মৌলভীবাজার-২ আসনে মনোনয়ন পাবেন। মফিজুল ইসলাম খান কামালের জন্য মানিকগঞ্জ-৩ ও জানে আলমের জন্য চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবে গণফোরাম।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডিও এর আগে ৩০ আসনের প্রস্তুতি নিলেও এখন ১৫টি চাইতে পারে। জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে অথবা ঢাকা-১৮ থেকে মনোনয়ন চাইবেন। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন চান কুমিল্লা-৪ আসন। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) আসনে ভোট করতে চান।

এছাড়া জেএসডির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল উদ্দিন পাটওয়ারীকে ঢাকা-১৪ (মিরপুর), সাবেক এমপি ও সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ গোফরানকে লক্ষ্মীপুর-১, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলালকে লক্ষ্মীপুর-৩, উল্লাপাড়ার সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু ইসহাককে সিরাজগঞ্জ-৪, জামালপুরের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আমির উদ্দিনকে জামালপুর-৪, জবিউল হোসেনকে চট্টগ্রাম-১০, মির্জা আকবরকে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন দেওয়ার ব্যাপারে জোর দেওয়া হবে।

ঐক্যফ্রন্টের আরেক শরিক নাগরিক ঐক্য এত দিন ৩০ আসন চাইলেও এখন চূড়ান্ত দরকষাকষির পর্যায়ে ১৫টি চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনিবন্ধিত এ দলের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ বা ঢাকা-১৭ (গুলশান) আসনে মনোনয়ন চাইবেন। তার দলের অন্যতম নেতা এস এম আকরাম হোসেন নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে প্রার্থী হতে চান। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা মোমিনুল ইসলাম লিটন লক্ষ্মীপুর-১, নইম জাহাঙ্গীর জামালপুর-৩, ফজলুল হক সরকার চাঁদপুর-৩, ডা. নাজিম উদ্দিন গাজীপুর সদর আসনে মনোনয়ন চাইবেন।

কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে সর্বোচ্চ তিনটি আসন দিতে পারে বলে জানিয়েছে বিএনপি সূত্র। তবে তিনি ৫টি আসন দাবি করছেন। টাঙ্গাইল জেলায় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ভোট ব্যাংক রয়েছে। কাদের সিদ্দিকী, দলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী জোটের মনোনয়ন পেতে পারেন। এর বাইরে কাদের সিদ্দিকী তার ভাই আজাদ সিদ্দিকীর জন্য টাঙ্গাইলের একটি আসনে ও দলীয় নেতা শফিউল ইসলামের জন্য নারায়ণগঞ্জে একটি আসনে মনোনয়ন চাইবেন। ঐক্যফ্রন্টের শরিক বিকল্পধারা বাংলাদেশ (একাংশ) ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের একটি আসনে ছাড় দিতে পারে বিএনপি।

এদিকে ৬১টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চান নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। এর মধ্যে ঢাকা-১৫ বাদে ৪৫টিকে তাদের সম্ভাবনাময় আসন বলছে জামায়াত। ৩৫টি আসনে জোটের মনোনয়ন চায় দলটি। ঢাকা-১৫ আসনটি তারা দলের সেক্রেটারি জেনারেলের জন্য চাইছে। জোটের মনোনয়ন না পেলে কয়েকটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করতে পারে তারা।

২০ দলের বাকি ১৮ শরিক অন্তত ৫০ আসন চাচ্ছে। এ জোটের অন্যতম শরিক এলডিপি এত দিন বিএনপির কাছে ২০টি দাবি করে আসছিল। এখন তারা ১০ আসন দাবি করবে। আসনগুলো হচ্ছে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ চট্টগ্রাম-১৪, রেদোয়ান আহমেদ কুমিল্লা-৭, আবদুল করিম আব্বাসী নেত্রকোনা-১, মো. আবদুল্লাহ চাঁদপুর-৩, আবদুল গনি মেহেরপুর-২, নূরুল আলম চট্টগ্রাম-৭, এম এয়াকুব আলী চট্টগ্রাম-১২, কফিলউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম-১৬, মাহবুব মোরশেদ ময়মনসিংহ-১০। তবে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, এলডিপির সাবেক ছয় এমপিসহ ছয়-সাতজনকে জোটের মনোনয়ন দেওয়া হবে।

অনিবন্ধিত জাতীয় পার্টির (জাফর) দাবি অন্তত ১০ আসন। তাদের চারটি আসন ছাড়তে পারে বিএনপি। জোটের অপর শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ আসন চাইবেন। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম শফিউল আলম প্রধানের স্ত্রী ব্যারিস্টার তাসনিয়া প্রধান পঞ্চগড়-২, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আবদুল কাদের এবং মুফতি ওয়াক্কাস মনোনয়ন পেতে পারেন। অনিবন্ধিত এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে নড়াইল-২ আসন দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা চলছে। এর বাইরে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ৩টি আসন পেতে পারে। বাকি দলগুলো আসন নাও পেতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল