একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

প্রার্থী বাছাইয়ে থাকছে চমক

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৯ | আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:০৯

প্রতীক ইজাজ ও বদরুল আলম মজুমদার

পুনঃতফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব রাজনৈতিক দলই। শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া। মনোনয়ন ফরম বিক্রি থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনে চিঠির মাধ্যমে নিজেদের জোটগত অবস্থানও পরিষ্কার করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রতীক নিয়েও চলছে শরিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা। এখন অপেক্ষা কেবল দলীয় প্রার্থী ঘোষণা ও ভোটের মাঠে নির্বাচনী প্রচারণায় নামা।

এরই মধ্যে দলীয় প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দলীয় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত। এই তালিকার মধ্যে নিশ্চিত হওয়া প্রার্থীদের কেন্দ্র থেকে সবুজ সংকেতও দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই মাঠেও নেমেছেন আটঘাট বেঁধে। তবে কোনো দলই এখন পর্যন্ত দলীয় প্রার্থী ঘোষণা দিচ্ছে না। দল দুটি চাচ্ছে তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ও মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা করেই চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করতে। দল ও জোটের একক প্রার্থী নিশ্চিত করতেই এ কৌশল নিয়েছে দল দুটি।

পাশাপাশি প্রার্থী নির্বাচনে সব দলই চাচ্ছে বিশেষ চমক দেওয়ার। এজন্য আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই বিতর্কিত কাউকে এবার মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জয় নিশ্চিত করতে বিপক্ষ দলের প্রার্থীকে আমলে নিয়ে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদলের সিদ্ধান্তও হয়েছে দলের মধ্যে। একইভাবে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দেশের পরিচিত সুশীল সমাজের একঝাঁক প্রতিনিধিকে নির্বাচনের মাঠে নামিয়ে চমক দেখাতে চায়। সেক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দল বিএনপির অনেক সুপরিচিত নেতারাও এবার বাদ পড়তে পারে দলের মনোনয়ন থেকে। এমনকি এই দুই দল বিভিন্ন ক্ষেত্রের অনেক তারকাকেও মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচনে জিততে পারেন এমন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। নিজেদের অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হবে না। নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে। তাদের দুর্বল মনে করলে চলবে না। জিততে পারেন ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের বিষয়ে অনেক সার্ভে করা হয়েছে।

একইভাবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জোটগত নির্বাচনে আসন সমঝোতার ব্যাপার থাকে। এখানে সব পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে প্রার্থিতা বাছাইয়ে তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিএনপি অনেক আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এখন অপেক্ষা জোটগত অবস্থান পরিষ্কার হওয়ার।

এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ৪০টি আসন নিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে আসন বণ্টন বা প্রার্থী বাছাই নিয়ে কোনো কমিটি বা সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া গণফোরাম ৩০, জেএসডি ৩০, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ২০টি আসন চায়। তবে তাদের জন্য ১৫টি আসন ছাড় দেয়া হবে। ভোটের আগে জাতীয়ভাবে পরিচিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলে তাদের জন্য ছাড়া হবে পাঁচটি আসন। সব মিলিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জন্য ছাড় দেয়া হবে ২০ আসন।

বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও যুক্তফ্রন্টসহ কিছু রাজনৈতিক দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৭ দিন পিছিয়ে গত সোমবার পুনঃতফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরে রাতে নির্বাচনের তফসিল পুনর্নির্ধারণের প্রজ্ঞাপনও জারি করে কমিশন। এমনকি গতকালও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘নির্বাচন আর পেছানোর কোনো উপায় নেই। ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ হবে। এই তারিখকে সামনে রেখে কাজ করে যেতে হবে। এই পুনঃতফসিলে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৮ নভেম্বর, বাছাই ২ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ৯ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২৩ ডিসেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

নিজস্ব জরিপ ধরেই দলীয় প্রার্থী দেবে আওয়ামী লীগ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিজস্ব জরিপকে গুরুত্ব দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে নিজস্ব জরিপে এগিয়ে থাকা প্রার্থীরা প্রাধান্য পাবেন বলে জানিয়েছেন গত সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের মনোনয়ন বোর্ডের এক অনির্ধারিত সভায়। সেখানে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানান, নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয় গণসম্পৃক্ত প্রার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।

দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, ১৫১ আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করে রেখেছে আওয়ামী লীগ। বাকি আসনগুলো রাখা হয়েছে, কৌশল অনুযায়ী নানা অঙ্কে নানা শরিক ও দলের মধ্যে বণ্টনের আশায়। এক্ষেত্রে অবশ্য দল থেকে সাফ বলে দেওয়া হয়েছে, জনসম্পৃক্ততা নেই এমন বড় বা ত্যাগী নেতার প্রতি এই মুহূর্তে দলের সমর্থন থাকবে না। জনপ্রিয় এবং নিশ্চিত বিজয়ী প্রার্থী যদি তিনি নবীনও হন দল তাকেই মনোনয়ন দেবে। এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি নানা জরিপ সেরে ফেলেছে আওয়ামী লীগ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের আমলনামা রয়েছে দলের সংসদীয় বোর্ডের হাতে।

প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, নৌকা প্রতীকে ১৪ দল এবং লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টি নির্বাচন করবে। নৌকা প্রতীক ১৪ দলের মধ্যে সীমিত থাকবে। ডা. বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আসতে পারে। যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে দলের জোট হতে পারে। এ ব্যাপারে আলোচনা চলছে। তবে আসনে নিজেদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। আসন ভাগাভাগি হলে দলের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেব। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন ভাগাভাগি হতে পারে। আমরা বসে নেই। ভেতরে-ভেতরে বৈঠক হচ্ছে।

আজ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সঙ্গে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে শুক্রবার থেকে টানা চার দিন ৩০০ আসনের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন চার হাজারের বেশি প্রার্থী।

এখনো সমঝোতা হয়নি জাতীয় পার্টির : জাতীয় পার্টি মহাজোট হয়ে নির্বাচন করার ঘোষণা দিলেও তাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এখনো আসন নিয়ে সমঝোতা হয়নি। ফলে দলটি দলীয় প্রার্থীও চূড়ান্ত করতে পারছে না। গত রোববার দলের পক্ষ থেকে ১০০ আসনের একটি তালিকা আওয়ামী লীগকে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েই জাতীয় পার্টি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। অবশ্য এর আগে দলের চেয়ারম্যান এরশাদ বলেছেন, আমরা আওয়ামী লীগের কাছে ১০০ আসনের তালিকা দিয়েছি। এর মধ্যে ৭০ আসন তো পেতে পারি। তবে এ বিশাল তালিকা পূরণ করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত নয় বলে দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন।

জাতীয় পার্টি সূত্র জানায়, ১০০ আসনের তালিকা দিলেও কোনোভাবেই তারা ৭০টি কাছাকাছি আসনের নিচে নামবে না। এমন লক্ষ্য নিয়ে দলটি ৩০০ আসনে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করছে। শেষ পর্যন্ত দলটির সঙ্গে সরকার সমঝোতা হয় কিভাবে তা দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চান এরশাদ। দলের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও চমক দেখাতে পারেন এরশাদের জাতীয় পার্টি। দেশের অতি পরিচিত কয়েকজন শিল্পপতিকে মাঠে নামিয়ে জোট মহাজোটের সঙ্গে পাল্লা দিতেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতারা।

বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টে থাকছে চমক : জোটগত নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান দল হলেও প্রার্থীসহ অনেক বিষয়েই ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে দলটি। এমনকি নির্বাচনী নানা বিষয়েও দল জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওপর নির্ভরশীল। বিএনপি দলীয় সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

দলীয় সূত্র মতে, বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের কৌশলের কারণেই নির্বাচনে আসতে বাধ্য হয় দলটি। নির্বাচনের আসার পর আসন ভাগ নিয়ে বিএনপিকে এখন পড়তে হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জে। ভোটের মাঠে বিএনপির অতিপরিচিত নেতারা বাদ পড়তে পারেন। জোটের হেভিওয়েট নেতারা নির্বাচনে এসে যেমন চমক দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে চমক দেখানোর মতো আরো কিছু প্রার্থীও দিতে পারে জোট। সুশীল সমাজের পরিচিত মুখদের নির্বাচনে নিয়ে আসার মধ্যে দিয়ে ভোটে মাঠেই এগিয়ে থাকার কৌশল নিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

জানা গেছে, ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরুতে নেতারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের জন্য ৫-১০টি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিএনপিকে। সেই তালিকা বিএনপির হাতে আসার খবর শোনা গেলেও যাদের নাম আলোচনায় আছে তাদের সবাই নির্বাচন করবেন কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন সুশীল সমাজের ১০ জনের একটি তালিকা বিএনপির হাতে দিয়েছে। আগামী নির্বাচনে তাদের ভোটে আসার জন্য অনুরোধও করেছেন ড. কামাল। সেই তালিকা থেকে কয়েকজন নির্বাচনে অংশ নিতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা। ড. কামাল যাদের নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা হলেন বর্তমানে কারাবন্দি ঐক্যফ্রন্ট নেতা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক, মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ান হাসান। বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে ড. কামালের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

এদিকে বিএনপি চায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ড. কামাল অংশগ্রহণ করুক। যদিও নির্বাচনে অংশগ্রহণের তার কোনো ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন। এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের সব সিনিয়র নেতারাই নির্বাচনে আসবেন বলে জানা গেছে। তাদের অধিকাংশ প্রার্থীকে ঢাকা থেকে নির্বাচন করানোর চিন্তা বিএনপির থাকলেও নেতারা নিজ নিজ এলাকায় ভোট করতেই বেশি আগ্রহী।

পিডিএসও/হেলাল