দল ও জোটে দ্বিমত সত্ত্বেও নির্বাচনের পথে বিএনপি

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২১

বদরুল আলম মজুমদার
ama ami

আওয়ামী লীগের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যেতে রাজি নয় বিএনপির মধ্যম সারির নেতারা। কিন্তু সিনিয়র নেতারা নির্বাচনকে দেখতে চান আন্দোলনের অংশ হিসেবে; এ ব্যাপারে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কথাও বলেছেন। এবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীনকে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার পথ বন্ধ করতে চান। এদিকে, তফসিল ঘোষণার পর দলটির নেতারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষমতা দিয়েছেন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ওপর।

গত বৃহস্পতিবার কারা আদালতে মির্জা ফখরুল চেয়ারপারসনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথাও বলেছেন। এতে খালেদা জিয়া নির্বাচনে থাকার ইঙ্গিত দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে জোটের নেতাদের মতামত নিতে বলেছেন। সব বিবেচনায় ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২৩ দলীয় জোট নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তারা সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেও, নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলছেন না। তাই বিদ্যমান তফসিলে এবার নির্বাচনের পথেই হাঁটছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ভোটের অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনে থাকা জোটের নেতারা ঘোষিত তফসিলকে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন বলে প্রতিবাদ জানালেও তারা ভেতর ভেতর নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দুই দফা সংলাপও করেছেন তারা। সেই সংলাপের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাবে অনেক প্রশ্ন থাকলেও জোটের নেতারা হতাশ নন। কারণ তারা আগে থেকেই জানতেন সরকার কোনো ছাড় দেবে না।

বিশেষ করে সংলাপ শুরুর আগে-পরে কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে আটক করা হবে না জানিয়ে যে, নিশ্চয়তা জোটকে দেওয়া হয়েছিল বাস্তবে তার ফল উল্টো হয়েছে বলে বিএনপির একাধিক নেতা দাবি করেছেন। সংলাপের আগে-পরে সারা দেশে গ্রেফতার অভিযান আরো বেশি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে এক ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠিয়ে সরকার এখানেও বিএনপিকে হতাশ করেছে।

নেতারা মনে করছেন এসব আচরণ দিয়ে সরকার আসলে বিএনপি ও জোটকে নির্বাচনের বাইরে ঠেলে দিতে চায়। কারণ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ ভয় পায়। এসব কারণে বিএনপি জোটকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে সরকার সবরকম চেষ্টাই করবে। সরকারের এমন চেষ্টার পাল্টা কৌশল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে আন্দোলনের কৌশল বলেই স্থির করেছে জোট। তাই বিদ্যমান তফসিলে বিএনপির এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত বলেই মত অনেকের। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেছেন, ক্ষমতাসীন দল যেনতেন একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবারও ক্ষমতায় আসতে চায়, সেটি তারা নিশ্চিত। তবে এবার খালি মাঠে গোল দিতে দেওয়া হবে না।

জানা গেছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, সংসদ ভেঙে দেওয়া ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিসহ ৭ দফা দাবিতে যে আন্দোলন কর্মসূচি চলছে, তা অব্যাহত থাকবে। বিভাগীয় পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্ট আরো বেশ কয়েকটি সমাবেশ করবে। একই সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া। বিএনপি ২৩ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আসন ভাগাভাগি করবে। প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার তারিখ পার হওয়ার পর বিএনপি আন্দোলন কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে পারে। সিনিয়র এক নেতা বলেছেন, তখন পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায় তা এখনি বলা মুশকিল।

নির্বাচন ও আন্দোলনের বিষয়ে গত বুধবার রাতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা ও সম্পাদকদের পরামর্শ নিয়েছে বিএনপি। সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা ছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না বলে তারা হাইকমান্ডকে জানিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে দাবি আদায়ে আন্দোলনের বিকল্প নেই বলেও মত দেন তারা। নেতারা বলেছেন, মামলা-হামলার কারণে নেতারা নিজ এলাকায় যেতে পারছেন না, কার্যালয়ে বসতে পারছেন না। অথচ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। এ অবস্থায় নির্বাচনে যাওয়া হবে ‘আত্মঘাতী’। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে গেলে তৃণমূল গ্রহণ করবে না। এমন আশঙ্কার কথা দলের নীতিনির্ধারকদের জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

এদিকে, রাজশাহীতে ঐক্যফ্রন্টের গতকালের সমাবেশে মির্জা ফখরুলসহ অধিকাংশ নেতা এখনই তফসিল ঘোষণার সমালোচনা করেন। তারা সরাসরি নির্বাচনের অংশ নেওয়া না নেওয়ার কথা বললেও আগামী দিনে রাজপথে দাবি আদায়ের আন্দোলনের কথা বলেছেন। সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিলে, দেশের সব রাজনৈতিক দলের সমান অধিকার নিশ্চিত করে এবং গ্রহণযোগ্য তফসিল হলেই কেবল নির্বাচন হবে।

সমাবেশে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটাতে হবে। দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, কেন জাতীয় নেতারা এক মঞ্চে একত্রিত হয়েছেন, কারণ দেশে এখন গণতন্ত্র নিখোঁজ। গণতন্ত্র ফেরাতে আমরা এক হয়েছি। তিনি এ সময় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার অধীনে নির্বাচন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন, সেই নির্বাচনে আপনারা ভোট দিতে পারবেন? শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে তিনি আজীবন প্রধানমন্ত্রী আর খালেদা জিয়া আজীবন জেলখানায় থাকবেন। তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারবেন না। তাই বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাব না।

সমাবেশে কৃষক শ্রমিক লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমি বিএনপির সভায় আসিনি। ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে এসেছি। তাই আমি যদি ক্ষমতায় আসি, তাহলে বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার বিভেদ ঘোচাব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি মানেই খালেদা জিয়া। তাই তাকে বন্দি করে রাখা যাবে না।

এ সময় প্রথমবারের মতো ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে এসে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি বলেন, নির্বাচনে যাব, এমন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পিডিএসও/তাজ