আলোচনা-সমালোচনায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩৭

প্রতীক ইজাজ

সুবিধা করতে পারছে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আত্মপ্রকাশের এক সপ্তাহ পরও ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে এই জোট। একেবারে শেষ মুহূর্তে বিকল্পধারা যোগ না দেওয়ায় শুরুতেই ভাঙন ও বিতর্কের মুখে পড়া জোটটির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। যদিও জোট নেতারা মুখে বলছেন নির্বাচনই তাদের মূল লক্ষ্য; কিন্তু এ নিয়ে নানা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে রাজনীতিতে। রাজনৈতিকভাবে আস্থায় নিতে পারছে না মানুষ। এমনকি স্বতন্ত্রভাবে না নিয়ে এই জোটকে ২০ দলীয় জোটের মতো বিএনপি নেতৃত্বাধীন আরেকটি জোট বলেই মনে করা হচ্ছে। নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা সইতে হচ্ছে এই জোটকে।

বিশেষ করে গত সপ্তাহে একের পর এক নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন জোট নেতারা। আত্মপ্রকাশের দিন বিকল্পধারাকে ঘিরে দৃশ্যমান নানা নাটক করেন জোট নেতারা। পরদিন বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচি মাহী বি. চৌধুরীর সঙ্গে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার মধ্যকার টেলিফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় বেশ বিব্রত অবস্থায় পড়ে জোট। সেখানে জোটের মধ্যকার নানা তথ্য বেরিয়ে আসে। একইভাবে টেলিভিশনের টকশোতে জোটের সঙ্গে থাকা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সেনাবাহিনী প্রধানকে নিয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ায় এবং ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন কলাম লেখক ও সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে নিয়ে অপ্রীতিকর মন্তব্য করায় এ দুজনকে নিয়ে এখন রীতিমতো বিব্রত জোট। এর মধ্যে ডা. জাফরুল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মইনুল হোসেনের ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ গণমাধ্যম। প্রকাশ্য মার্জনা প্রার্থনা ও সাত দিন তার সংবাদ বর্জনের আহ্বান এসেছে নারী সাংবাদিকসহ সুশীলসমাজের পক্ষ থেকে।

প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে এখন ফ্রন্ট। শুরুতেই বিদেশিদের দ্বারস্থ হওয়ায় দেশের মানুষের প্রতি ফ্রন্টের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক মহল। এমনকি ওই অনুষ্ঠানে কূটনীতিকদের নানা প্রশ্নে ফ্রন্টের সঠিক কোনো দিকনির্দেশনাও দিতে পারেনি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এর ফলে ভেতর ও বাইরে জোটের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।

এমন অবস্থায় ঐক্যফ্রন্ট কতদূর এগোবেÑজানতে চাইলে পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছে বিশ্লেষক ও রাজনীতিকদের পক্ষ থেকে। বিশ্লেষকদের অনেকে শুরুতেই হোঁচট খাওয়ায় দ্বিধান্বিত এর দীর্ঘ পথচলায়। রাজনীতিতে এটি তেমন প্রভাব ফেলবে না বলেও মত তাদের। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দল বিএনপি অনেকটা দুর্বল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ায় বিরোধী জোট একটা শক্ত ভিত পেল। এর মাধ্যমে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশীদারত্বমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনাটা জোরালো হয়েছে। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, এ জোট রাজনীতিতে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। স্বাধীনতাবিরোধী, মুুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সবাই একসঙ্গে হয়ে মূলত তারা আওয়ামী লীগবিরোধী।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন বলেন, বিএনপি এখন দুর্বল। জোট হওয়ায় তারা সবল হবে। আমরা চাই, শক্তিশালী বিরোধী দল হোক। জোটের ফলে একটা সুবিধা হলো, বিরোধী দল হিসেবে একটা জোট থাকবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তাদের দাবি জোরালো হবে। তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বিএনপি ইতোমধ্যে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। জনবিচ্ছিন্ন এ দলের সঙ্গে ঐক্য নিয়ে দেশবাসীর কোনো চিন্তা নেই। আওয়ামী লীগ এটা নিয়ে ভাবছে না। নৈতিকতাহীন এ জোট জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গত ১৩ অক্টোবর শনিবার বিএনপিকে নিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি ও গণফোরামের সঙ্গে এ জোটে রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য। এ ছাড়া এই ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল ইসলাম ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিসংবলিত ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে সাত দফা দাবি ও ১১টি লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়।

এই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ঘিরে এখন সরব রাজনীতি। চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ঐক্যফ্রন্টের শরিক বিএনপি নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। সর্বশেষ গত শুক্রবারও নির্বাচনের আগে কামাল হোসেনের সঙ্গে বিএনপির জোট গঠনে আওয়ামী লীগের মধ্যে ভয় ঢুকেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এর পাল্টা জবাবে বিএনপিকে নিয়ে কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে আওয়ামী লীগের ‘বিচলিত হওয়ার কিছু নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল তিনি ‘ওই ঐক্য কতটা অটুট থাকবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে’ বলেও মন্তব্য করেন।

তবে এসব সমালোচনাকে আমলে নিতে নারাজ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ ব্যাপারে ফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাজনীতি করতে এসেছি। সমালোচনা শুনতে হবে। তবে আমরা আমাদের লক্ষ্যে এগোব। আমরা চাই সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। সেখানে অটল থাকব।

ফ্রন্ট সূত্র মতে, অনুমতি না মেলায় সিলেটে এক দিন পিছিয়ে ২৪ অক্টোবর বুধবার সমাবেশ করা হবে। এরপর ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামে সমাবেশ করা হবে। এর আগের দিন ২৬ অক্টোবর রাজধানীতে পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। চলছে জোট সম্প্রসারণের চেষ্টা। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আরো কয়েকটি দল যোগ দিতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের আলাপ হয়েছে বলে জোটের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে নাগরিক ঐক্যের নেতা মোবারক খানের বাসায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক হয়। সেখানে সমন্বয় কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। এ জোটের একটি সূত্র জানায়, আজকের বৈঠকটিতে আরো কয়েকটি দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। তাদের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উদারমনা আরো কিছু মানুষকে এ জোটে আসার জন্য বলা হবে। এ ছাড়া পাঁচ-ছয়টি দল ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন দলগুলোর যোগ দেওয়ার ঘোষণা আসতে পারে। এ ছাড়া এই জোটে নিজেদের মূল বিকল্পধারা দাবি করা নুরুল আমিন ব্যাপারীর অংশটিও শিগগিরই যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমনকি সাবেক ছাত্রদল নেতা সানাউল হক নীরুর নেতৃত্বে গত বুধবার আত্মপ্রকাশ করা ‘মুভমেন্ট ফর জাস্টিস’ ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিতে পারে বলেও জানিয়েছেন জোট নেতারা। গত শতকের ৮০-এর দশকের ছাত্রদল নেতা নীরু ১৯৯০-এর ডাকসু নির্বাচনের আগে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন। তার বিরুদ্ধে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও করেন নব্বইয়ের ছাত্রনেতারা।

শুরু থেকেই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে সতর্ক নজরের মধ্যে রেখেছে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আত্মপ্রকাশের পর এই জোটের তীব্র সমালোচনায় নামেন সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা। তারা জোট শরিক দলের পাশাপাশি ফ্রন্ট নেতাদের বিগত সময়ের নানা বিতর্ক তুলে ধরছেন। গতকালও বাণিজ্যমন্ত্রী ও দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ড. কামাল হোসেন এখন বিএনপির দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু আমরা তার সামর্থ্য সম্পর্কে জানি, কারণ তিনি একসময় আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসনে নির্বাচন করে জিতেছিলেন। ৮৬ সালে কিংবা ৯১ সালের নির্বাচনে নৌকা নিয়ে হেরেছিলেন। এমনকি কূটনীতিকদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের মতবিনিময়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তারা আপনাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে ভাবছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আর কোনো কাজ নেই যে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বসে থাকবে।

নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি চক্র বিএনপি-জামায়াত নতুন সাথি নিয়ে অযৌক্তিক দাবি তুলে অশুভ চক্রান্ত শুরু করেছে বলে মন্তব্য ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের। তিনি জানান, ১/১১-এর সময় দেশবাসী ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা দেখেছে। তিনি তখনকার অনির্বাচিত সরকার সম্পর্কে বলেছিলেন, এ সরকার যত দিন ইচ্ছা চালিয়ে যেতে পারবে। আর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ৭৫-এর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনি মোশতাককে নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক লীগ করেছিলেন। এই মইনুল ১/১১-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ছিলেন। এখন সেই মইনুল হোসেন, বিএনপি, জামায়াত সব এক হয়ে গেছেন। তারা পরীক্ষিত গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি।

এদিকে ঐক্যফ্রন্টকে কেন্দ্র করে নানা জোটে ভাঙা-গড়ার খেলা শুরু হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে গেছে ন্যাপ ও এনডিপি। জামায়াত না ছাড়ায় ঐক্যফ্রন্টে যায়নি বিকল্পধারা। ঐক্যফ্রন্টে যোগ না দেওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়ে বিদ্রোহ করা দলের সহসভাপতি বাদলসহ কয়েকজনকে ওই দিনই বহিষ্কার করেন বিকল্পধারা সভাপতি বি. চৌধুরী। এর প্রতিক্রিয়ায় এক সপ্তাহ পর বহিষ্কৃত সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল গত শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন এবং বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহি বি. চৌধুরীকে দল থেকে অব্যাহতি দেন।

পিডিএসও/হেলাল