লক্ষ্য জাতীয় নির্বাচন

ভোটে জোটের রাজনীতি

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:১৭

প্রতীক ইজাজ ও বদরুল আলম মজুমদার

সংবিধান অনুযায়ী, আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবরের পর শুরু হবে নির্বাচনী ক্ষণগণনা। তফসিলও ঘোষণা হবে ক্ষণগণনা শুরুর পর যেকোনো দিন। সাধারণত তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত দেড় মাস হাতে রেখে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সে হিসাবে নির্বাচনের বাকি দুই থেকে আড়াই মাস।

ফলে অক্টোবরের শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর জোটের শরিক দল ও দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত ও ঐক্যবদ্ধভাবে সংগঠনকে নির্বাচনমুখী করাসহ মাঠের নির্বাচনী প্রস্তুতিতেই ব্যস্ত থাকার কথা। এমনটা শুরুও হয়েছিল। মাঠেও নেমেছিল রাজনৈতিক দলগুলো। চলছিল নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক সফর। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই নির্বাচনী প্রস্তুতি এখন রূপ নিয়েছে জোট রাজনীতিতে। নির্বাচনী রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গড়া জোট-মহাজোটকে ঘিরেই। এককভাবে নির্বাচনের চেয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোরও মনোযোগ এবার জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে। তাই বিদ্যমান জোট রক্ষার যেমন চেষ্টা চলছে; তেমনি চলছে জোট সম্প্রসারণের চেষ্টা। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ছে ছোট ছোট, এমনকি নিবন্ধনহীন দলগুলোও। বড় জোট ভাঙছে। নতুন জোট হচ্ছে। রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে দরকষাকষি ও শর্ত পূরণে চলছে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বৈঠক। মাঠের প্রস্তুতির চেয়ে তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যস্ত সময় কাটছে জোট রাজনীতি সামাল দিতেই।

মূলত গত শনিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়েই নির্বাচনী রাজনীতি জোট রাজনীতির দিকে মোড় নেয়। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেন বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে এ জোট করার পর থেকেই জোট রাজনীতি অনেক বেশি সামনে চলে আসে। রাজনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে জোট রাজনীতির প্রভাব। বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে জোটে আসতে হবে—এমন শর্তে রাজি না হওয়ায় শেষমুহূর্তে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আসেনি বিকল্পধারার সভাপতি ও সাবেক

রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ফলে শুরুতেই বিতর্ক ও ভাঙনের মুখে পড়ে জোটটি। এমনকি এই জোট গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় গত মঙ্গলবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে চলে যায় দুই শরিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)।

এমনকি নড়েচড়ে বসার খবর পাওয়া যাচ্ছে ছোট ছোট দলগুলোরও। যদিও এসব দলের বেশিরভাগেরই নিবন্ধন নেই ও নামসর্বস্ব; কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে এখন বেশ গুরুত্ব বেড়েছে তাদের। মাঠ দখলে রাখতে ও ভোটের হিসাবে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও নজর রাখতে হচ্ছে এসব দলের ওপর। জোট অক্ষুণ্ন রাখতে জোটপ্রধান দলকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে শরিক দলগুলোর ব্যাপারে। এমনকি অন্য জোট ছেড়ে আসা বা অন্য জোট থেকে দল ভাগিয়ে নিজেদের জোট সম্প্রসারণ ও নতুন জোট গঠনের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

এই জোট রাজনীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ওপর। জোট রাজনীতি সামাল দিতে গিয়ে অনেকটাই থেমে গেছে মাঠের নির্বাচনী প্রস্তুতি। জোট পরিস্থিতি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন নিয়ে সমঝোতা করতে পারছেন না দলের নীতি নির্ধারকরা। এর ফলে পুরনো শরিক দলগুলো তো বটেই; মনোনয়ন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দলের বর্তমান সংসদ সদস্য ও জনপ্রিয় নেতারাও।

এমন পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন—জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, নির্বাচনের আগে জোট নতুন কিছু নয়। মতাদর্শে অভিন্ন দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে জোট করতে পারে। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু কেউ বা কোনো মহল যদি কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত করতে জোট করে, তা হলে তা এদেশের মানুষ মেনে নেবে না। এগুলো গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্যও ভালো না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে জোট-মহাজোটের খেলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। ছোট দলগুলো এককভাবে কিছু করতে পারবে না বিধায় এগুলো বড় দলের ওপর নির্ভর করে। তবে আদর্শ ও নৈতিকতা থেকে কিছু দল সিদ্ধান্ত নিলেও অধিকাংশ দলই ব্যক্তি লাভের কথা ভেবে জোটে ভেড়ে। এবারও এ ধরনের জোট পরিবর্তনের বিষয় ঘটবে। তবে বিএনপি বরাবরই এ ব্যাপারে সতর্ক।

খোঁজ নিয়ে বর্তমানে দেশে অন্তত ১৪টি রাজনৈতিক জোটের নাম পাওয়া গেছে। এসব জোটে মোট রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১৯৩। এর মধ্যে নিবন্ধিত দল কেবল ৩৯টি। আবার একই দল সমমনা একাধিক জোটেও আছে। এমনকি নির্বাচনকে সামনে রেখে আরো দু-তিনটি জোট গঠনের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

বিশেষ করে বিরোধীদের জোট রাজনীতির দিকে সতর্ক নজর রাখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি জোটের রাজনীতিতে পাল্টা কৌশল নিয়েও এগোচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট মিত্র বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিএনপির ভোটে আসাটা নিশ্চিত হলে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে ২০০৮ সালের মতো মহাজোটও হতে পারে। এর বাইরে বর্তমান সরকার-ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমানের ও তরীকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে সম্প্রতি ধর্মভিত্তিক নতুন জোট হয়েছে। নাম ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স। এতে ১৪টি দল আছে। এই জোটও আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে।

আবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন নিয়ে দরকষাকষির প্রস্তুতি নিলেও দলের চেয়ারম্যান এরশাদ নিজে আলাদা একটি জোট গঠন করেছেন। নাম সম্মিলিত জাতীয় জোট। এর মধ্যে যে ৫৮টি দল আছে, এ জোট নিয়ে তিনি নিজেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটে ভিড়তে চান।

পাশাপাশি ১৪-দলীয় জোট সম্প্রসারণের কথাও শোনা যাচ্ছে। বিএনপির সাবেক নেতা নাজমুল হুদার ৩৪ দলীয় জোট বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট অ্যালায়েন্স (বিএনএ) বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটে যুক্ত হওয়ার চেষ্টায় আছে। আবুল কালাম আজাদ নেতৃত্বাধীন বিএনএফ নামক জোটটি বর্তমানে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই রয়েছে। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের শরিক জাসদের দুই ভাগই ১৪-দলে রয়েছে। বিকল্পধারা ও বিএনপির সঙ্গে থাকা এলডিপিকেও পাশে পেতে চায় আওয়ামী লীগ। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গত নির্বাচন বর্জন এবং বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করে নানা কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু এখন দলটি আওয়ামী লীগের জোটে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া আরো কিছু দলকে নির্বাচনের স্বার্থে সঙ্গে রাখতে চায় ক্ষমতাসীনরা।

এদিকে, ছোট হতে শুরু করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিএনপির ২০ দলীয় জোট থেকে ন্যাপ ও এনডিপি বের হয়ে গেছে। সামনে আরো দুটি দল জোট ছাড়ার ঘোষণা দিতে পারে বলে জানা গেছে। এর আগে জোটের সঙ্গে থেকেও তারা কোনো আসন পায়নি এবং ভবিষ্যতেও পাবে না বলেই ইঙ্গিত পায় দলগুলো।

২০ দলীয় জোটসূত্র জানায়, জোট থেকে সদ্য বের হওয়া দল দুটি বিকল্পধারা সঙ্গে যোগ দিতেই ২০ দল ছেড়েছে। এমনকি ন্যাপ ও এনডিপির মতো একই কারণ দেখি জোট ছাড়তে পারে মুসলিগ লীগ ও ইসলামিক পার্টি। মূলত বিকল্পধারার ডাকে এ দলগুলো জোট থেকে বের হচ্ছে বলে মনে করছেন জোট নেতারা।

অন্যদিকে, বিকল্পধারা নিজেই একটি জোট করতে চাইছে। জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট থেকে বাদ দেওয়ার প্রেক্ষাপটে বি. চৌধুরী এনডিপি, ন্যাপ, খেলাফত আন্দোলন, মুসলিম লীগ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ছাড়াও বিএনপির সাবেক-বর্তমান অনেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন নতুন জোট গড়তে।

এমনকি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সম্প্রসারণের কথাও ভাবা হচ্ছে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা জোটের বাইরে থাকা আরো দলকে ফ্রন্টে যুক্ত করতে কাজ করছেন। বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ থেকে ৪টি দলকে নিজেদের জোটে চায় ঐক্যফ্রন্ট। কর্নেল অলির এলডিপি, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমানের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, প্রয়াত কাজী জাফরের জাতীয় পার্টি, বীর প্রতিক ইব্রাহিমের কল্যাণ পার্টিসহ ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোটসহ ইসলামপন্থি কয়েকটি দলকে নিয়ে জোটের পরিধি বাড়ানোর কাজ করছেন নেতারা।

গত জুলাই মাসে বামপন্থি আটটি দল নিয়ে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ নামে একটি নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করে। এই জোটের দিকে লক্ষ্য আওয়ামী লীগের। তবে বিএনপি চাইছে এ জোট যেন ক্ষমতাসীনদের দিকে ভিড়তে না পারে। এর বাইরে আরো কিছু বামদল নিয়ে আরো একটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে অচিরেই। এতে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), মজদুর পার্টি, স্বাধীনতা পার্টি, বাংলাদেশের শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় বিপ্লবী পার্টি ছাড়াও বিভিন্ন বাম জোট থেকে দু-একটি দল আসতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল