জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

আমলে নিচ্ছে না আ.লীগ : লাভ দেখছে বিএনপি

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:১৭

প্রতীক ইজাজ

অবশেষে আত্মপ্রকাশ করল বহুল আলোচিত নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গত শনিবার বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই জোটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে জোটের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা না থাকায় ও ভাঙন নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়ায় শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়ল সদ্য গঠিত জোটটি। এমনকি জোটে থাকা না থাকা নিয়ে গতকাল বিকল্পধারার মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত নাগরিক ঐক্যের প্রধান মাহমুদুর রহমান মান্নার টেলিফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় আরেক দফা ধাক্কা খেল এই জোট। বিশেষ করে ওই কথোপকথন থেকে জোটের মধ্যকার নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই এর স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, এই ‘জগাখিচুড়ি ঐক্য’ টিকবে না। প্রক্রিয়া শুরুর মাস না গড়াতেই বি. চৌধুরী ও কামাল হোসেনের সম্পর্কের এই ফাটল দৃশ্যত আওয়ামী লীগ নেতাদের ভবিষ্যদ্বাণীর সঠিকতাই তুলে ধরল। তবে এই জোটকে বৃহৎ অর্থে পৃথক রাজনৈতিক ঐক্য বলতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্য নয় বরং ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি বিএনপি নেতৃত্বাধীন আরেকটি জোট বলা চলে।

তারপরও নির্বাচনী রাজনীতিতে নানাভাবে আলোচনায় আসছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই জোটকে নানাভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জোটের প্রধান দল বিএনপি। মূল লক্ষ্য জাতীয় নির্বাচন। এমনকি এই জোটের ভবিষ্যৎ রাজনীত ও লাভ-ক্ষতি নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। এই জোট কি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করবে? নাকি বিএনপির আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করবে? জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে? নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে? এই জোটের ভবিষ্যতই বা কি? এমনতর নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনীতিতে। সরকারের ভেতর ও বাইরে এবং নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে।

শুরুতেই ভাঙন এবং জোটের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাস দেখা দেওয়ায় এই জোটকে অতটা আমলে নিচ্ছে না সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে গঠিত হওয়া নতুন এ জোটকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণকেও খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার ও দলের নীতিনির্ধারকরা। অন্যদিকে, আকার যেমনই হোক জোট গড়তে পারার মধ্যেই এক ধরনের স্বস্তি ও লাভ দেখছে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। বিশেষ করে জোটের গঠন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বিএনপির ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়ার শর্তে অনঢ় থাকা বিকল্পধারা জোটে না থাকায় বিএনপি নিজেদের জন্য লাভ হিসেবেই দেখছে।

আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই এই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নানা সমালোচনা করে আসছে। জোট গঠনের পর গতকাল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতা ও সরকারের মন্ত্রীরা জোটের তীব্র সমালোচনা করেছেন। গতকাল রোববার বিকালে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এক জনসভায় শেখ হাসিনা ‘নীতিবানরাই খুনি-দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে ঐক্য করেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, অগ্নি সন্ত্রাস করে, যারা এতিমের টাকা মেরে খায় আজ তাদের সঙ্গে ঐক্য করেছেন সেই কামাল হোসেন গং। তিনি নেতা মেনেছেন এমন একজনকে যিনি পলাতক, মানিলন্ডারিংয়ে সাজাপ্রাপ্ত।

একইভাবে গত শনিবার জোট গঠনের পরপরই খুলনায় আওয়ামী লীগ নেত্বত্বাধীন ১৪ দলের মহাসমাবেশে ১৪ দলের সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জাতীয় ঐক্যের সমালোচনা করে বলেন, খালেদা জিয়া ভাড়াটে খেলোয়াড়দের নিয়ে এসেছেন। তাদেও কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। নাসিম এমনও বলেন, যতই ষড়যন্ত্র করুন, নির্বাচন ঠেকাতে পারবেন না, নির্বাচন হবেই। একইভাবে এই নতুন জোটের সমালোচনা করে গতকাল তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, এটা জোট নয়, এটা ঘোঁট। ঘোঁট পাকানোর মধ্য দিয়ে দেশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছেন তারা। ‘জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-যুদ্ধাপরাধী এবং স্বীকৃত দুর্নীতিবাজকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণতন্ত্র উদ্ধারের ঘোষণা জাতির সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরা’ বলেও মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী।

এসব সমালোচনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওপর সতর্ক নজর রাখছে বলেও জানিয়েছে দলীয় সূত্রগুলো। দলের মতে, বিরোধীদের ঐক্য হবে জোড়াতালির। তাই নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি বিরোধীদের জোর সমালোচনার নীতি নিয়েছে দল। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, শুরুতে যতটা ভাবা হচ্ছিল, বিকল্পধারা না থাকায় ঐক্য অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাছাড়া জোটভুক্ত দল ও নেতাদের মধ্যে এখনো পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা থাকায় এই জোট শেষ পর্যন্ত কি করতে পারবে, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে এই জোট এবার নির্বাচনে অংশ নেবে বলে নেতাদের বিশ্বাস। সুতরাং এই ঐক্যকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নেবে আওয়ামী লীগ। ঐক্যফ্রন্টের গতিবিধি দেখে সেসব কৌশল প্রয়োগ করা হবে। এজন্য বিরোধী জোটের কার্যক্রম আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ হওয়ায় দলের পক্ষ থেকেও জোট সম্প্রসারণের, নতুন মিত্র তৈরি এবং এসব জোট ও মিত্রদের সঙ্গে দলীয় আসন সমঝোতার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত এ মোর্চাকে মোকাবিলার কৌশলও নির্ধারণ করা হবে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, এই জোটকে নিয়ে ভাবছে না আওয়ামী লীগ। জোটভুক্ত দল ও ব্যক্তিরা জনবিচ্ছিন্ন। জনগণের কাছে এদের গ্রহণযোগত্যা নেই। তারপরও তারা আবার দেশ-বিদেশের আদালতে স্বীকৃত সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ দল বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করেছে। এমনকি যেসব দাবি তারা করেছে, সেগুলো সংবিধানবিরোধী। ফলে এ জোট দেশ ও জনগণের কোনো কল্যাণে আসবে না। জনগণ এ জোটকে আমলে নিচ্ছে না। ‘তবে সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র ও নাশকতার চেষ্টা করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হস্তে দমন করবে’ বলেও সতর্ক করে দেন মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ এসব ষড়যন্ত্রকারীকে প্রতিরোধ করবে। এজন্য আমরা মাঠে রয়েছি।

অবশ্য জোট গঠনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে এক ধপ্রণর স্বস্তি দেখছে বিএনপি। দলীয় সূত্র মতে, বিকল্পধারা বাদ পড়ায় জোটে দলের অবস্থান শক্ত হলো। বিকল্পধারা জামায়াতকে ছাড়ার প্রশ্নে অনঢ় ছিল। শুরু থেকেই নানাভাবে চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাই টিকতে পারল না। এর ফলে এখন এই জোটে বিএনপির অবস্থান দৃঢ় হলো। একদিকে ২০ দলীয় জোট, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। দুই জোটকে নিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নির্বাচনী দাবি আদায়ে শক্ত আন্দোলনে যাবে তারা। সব আন্দোলনই হবে যুগপৎভাবে।

তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ওপর বিএনপিও সতর্ক নজর রাখবে বলে জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, সরকার জোটকে নানাভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করবে। যুগপৎ আন্দোলন দিতে বাধা দেবে। এসব দিকে দলের পক্ষ থেকে নজর রাখা হবে।

বিএনপি নেতারা এমনও জানান, ঐক্যফ্রন্টের ১৫০ আসনে ছাড়ের জবাবে শতাধিক আসন ছেড়ে দিতে প্রস্তুত দল। এসব দাবি দাওয়া নিয়ে গত এক মাসে বিএনপিতে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং দলের মহাসচিব লন্ডন সফরকালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আলোচনা করেন। আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ায় দেশে ফিরে মির্জা ফখরুল ঐক্যের ব্যাপারে আরো বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেন। এমনকি বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রধানমন্ত্রী পদে দুই বছরের জন্য ছাড় দিতে বিএনপির কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। কারণ হিসেবে নেতারা বলছেন, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে এখনো জটিলতা কাটেনি। তিনি নির্বাচন করতে পারলে এক কথা। আর যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তাহলে তার জায়গায় ড. কামালকে প্রধানমন্ত্রী পদে মানতে অসুবিধা নেই।

এসব ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নানা ইস্যুতে ঐক্যমত হয়েছে বলেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশ করল। চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আরো হবে। রাজনৈতিক মেরূকরণের সময় অনেক ইস্যু ও প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তবে আমাদের এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তা না হলে এসব স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। এর আগে গত শনিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে নতুন আঙ্গিকে অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু হলো।

পিডিএসও/হেলাল