বৃহত্তর ঐক্য কোন পথে

যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে এখনো সংশয়

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৩৭ | আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৪৬

বদরুল আলম মজুমদার

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় জড়িত সংশ্লিষ্ট দলগুলো নিজেদের দূরত্ব ঘোচাতে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। গতকাল শুক্রবার জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জে এস ডি) সভাপতি আ স ম আবদুুর রবের রাজধানীর উত্তরার বাসায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠকে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা। আজ তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। তবে এ সমঝোতা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা নিয়ে এখনো সংশয়ে সংশ্লিষ্টরা।

গতকালের বৈঠকসূত্র জানায়, ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরম থেকে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া পাঁচ দলের নেতারা। এ ছাড়া ‘জাতীয় যুক্তফ্রন্ট’ নামে জোটের একটি নতুন নামও নির্ধারণ করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে সাত দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দাবি আদায়ে শিগগিরই নতুন কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত আসছে বলেও জানা গেছে।

বিএনপি দলীয় সূত্রমতে, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গঠনে চেষ্টা করছে দলটি। গত কয়েক মাস থেকে এ প্রক্রিয়ায় অনেকদূর এগিয়েও যায় দলটি। দলের নেতারা জানান, সে প্রক্রিয়া এখন প্রায় শেষের পথে রয়েছে। বিএনপি ও অন্যান্য দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি লিয়াজোঁ কমিটি গত ১০ দিনে কমপক্ষে পাঁচবার বৈঠক করেছে। এই কমিটিতে আছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, যুক্তফ্রন্টের আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, মেজর (অব.) এম এ মান্নান, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মোস্তফা মহসীন মন্টু ও আ ব ম মোস্তফা আমীন। গত ৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দেন নেতারা।

এদিকে, বেশ কিছু দাবি-দাওয়ার বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য এক ধরনের চাপ তৈরি করছিলেন বিকল্পধারার নেতারা। তারা মনে করছেন, চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার আগেই নিজেদের দাবি দাওয়ার বিষয়ে এখনই বিএনপিকে লিখিত দিতে হবে। তবে এমন অবস্থান নিতে রাজি ছিলেন না যুক্তফ্রন্টের অপর দুই দলের নেতা। তারা মনে করছেন, আগে আন্দোলন করে একটি অবস্থান তৈরি করে বাকি দাবি-দাওয়ার বিষয়ে পরে আলোচনা হবে। এ অবস্থায় বিকল্পধারার সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের অপর দুই দলের বেশ টানাপোড়ন সৃষ্টি হয়।

ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির এক নেতা বলেন, আগে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তারপর দাবি-দাওয়া সামনে আসতে পারে। ক্ষমতায় গেলে কীভাবে সরকার পরিচালিত হবে, কিংবা আসন বণ্টনের বিষয়টির সুরাহা কীভাবে হবে—তা এখনই মুখ্য কোনো বিষয় নয়। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামার আগেই শর্তজুড়ে দিলে তা কাক্সিক্ষত জায়গায় নাও যেতে পারে। ঐক্য প্রক্রিয়ার একটি সূত্রের দাবি, বিকল্পধারার ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এরপর অনেক দূর গড়ায় এবং বৈঠকে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। দু-একজন নেতা বৈঠকে বেশ চড়া গলায় কথা বলেন। বৈঠক থেকেই অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ফোন করে মান্নান বলেন, তার কথা আমলে না নিয়েই

যুক্ত ঘোষণা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্ত ঘোষণায় তাহলে লিখতে হবে যে সেখানে আসন ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা হয়নি। তখন রবসহ উপস্থিত অন্য নেতারা বলেন, এটি লেখার প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া বৈঠকে যোগ দেওয়া নেতাদের ‘অথরিটি’ আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা ওঠে। বলা হয়, বিকল্পধারার নেতারা দলের মহাসচিবকে অথরিটি দেননি। এমন বির্তকের মুখে গতকালের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিকল্পধারা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহী বি চৌধুরী। তার উপস্থিতিতে দাবি দাওয়ার বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কথা তোলেন আ স ম আবদুর রব। আলোচনা শুরুতেই তিনি গত মিটিংয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে বলেন, আমরা যেসব দাবি-দাওয়া নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কথা বলেছি সেগুলো নিয়ে বিএনপিও তেমন আপত্তি করেনি। আসন হিসাব করে ১৫০ দিতে হবে এমন কথা যুক্তফ্রন্ট থেকে বলা হয়নি। তবে, বিকল্পধারার নেতারা এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, এটা বিএনপিও জানে আমরাও জানি। সব কিছু ঠিকমতো এগুলে এসব বিষয়ে তেমন সমস্যা তৈরি নাও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবেন বিএনপির নেতারা।

গতকালের বৈঠকের পর কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে যৌক্তিক সব কিছুই বিএনপির পক্ষ থেকে পূরণ করার আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে দলের চেয়ারপারসনও বেশ ইতিবাচক। গতকালের বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা জানান, বৃহত্তর ঐক্যের সব কিছু চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন একটি নামও নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগির এক সঙ্গে দাবি আদায়ের আন্দোলনে মাঠে নামারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। সব কিছুই জানতে আরো দুই দিন অপেক্ষার পরামর্শ দেন বিএনপির এ নেতা।

গতকালের বৈঠকে ‘জাতীয় যুক্তফ্রন্ট’ নামে ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত দলগুলো মাঠে নামার লক্ষ্যে ৭ দফা দাবি ও ১১টি লক্ষ্য চূড়ান্ত করেছে বলে বৈঠকসূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে অভিন্ন দাবিগুলো হলো—

১. সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা।

২. যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা।

৩. নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।

৪. শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব কালো আইন বাতিল।

৫. নির্বাচনের ১০ দিন আগে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন।

৬. দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা।

৭. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো মামলা না দেওয়া।

অন্যদিকে, ১১ লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে—

১। মুক্তি সংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

২। ৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের যুগোপযোগী সংশোধন করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা।

৩। দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা।

৪। দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চয়তা বিধান করা।

৫। জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও দলীয়করণের কালো থাবা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা।

৬। রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জনগণের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত।

৭। জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

৮। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করতে না দেওয়া।

৯। সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়—এই নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

১০। বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত ও পুনর্বাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা।

১১। দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনী আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।

গতকালের বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, সহ-সভাপতি তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, নাগরিক ঐক্যের, প্রধান সমন্বয়ক শহীদুল্লাহ কায়সার, কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জাহিদ, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহি বি চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।

পিডিএসও/হেলাল