নির্বাচনী হাওয়া : বরগুনা-১

আসনসংখ্যা কমায় প্রার্থী বেশি

আ.লীগে দুই শক্তশালী, বিএনপিতে বহু

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৫০ | আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ১০:১৪

এম এ সাইদ খোকন

বরগুনার তিনটি আসন ভাগ করে ২০০৮ সালে দুটি আসন করা হয়। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এলাকা হলেও সে সময়ের নির্বাচন কমিশন দুটি আসনে বিভক্ত করে। বরগুনা, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে বরগুনা এক (১০৯) এবং পাথরঘাটা বামনা ও বেতাগী নিয়ে বরগুনা দুই (১১০) সংসদীয় আসন ভাগ করা হয়েছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে (১০৯) বরগুনা এক আসনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠছে। বরগুনা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও বিএনপি চাইবে এ আসনটি তাদের দখলে নিতে। আওয়ামী লীগের ভেতরে রয়েছে কোমল দ্বন্দ্ব, বিএপিতে প্রকাশ্যে। জাতীয় পার্টি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বরগুনায়। নির্বাচন সামনে রেখে নড়েচড়ে বসেছে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

বরগুনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের দৌড়ে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, সাবেক এমপি ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন সবচেয়ে এগিয়ে। এ ছাড়া আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কবির, যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু, সদস্য মশিউর রহমান শিহাব ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম সরোয়ার ফোরকান। ভোটের সমীকরণে তাদের অংশগ্রহণ মন্দ নয়।

বরগুনায় আওয়ামী লীগের একক আদিপত্য বিস্তার থাকলেও গত পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে দলে শুরু হয়েছে নীরব যুদ্ধ। এমনকি পৌর নির্বাচনের ভোটের দিনে কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজের ওপর গুলির ঘটনা ঘটে। তাতে আহত হন প্রার্থীসহ বেশ কয়েকজন কর্মী। পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এমন বিপদের সময় জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশে পাননি তিনি। সে থেকেই ভেতরে ভেতরে চলছে কোমল দ্বন্দ্ব। তাই মনোনয়ন দৌড়ে বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর প্রধান প্রতিপক্ষ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি মো. দেলোয়ার হোসেন। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ ও সদস্য মশিউর রহমান শিহাব।

বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু নৌকা প্রতীক নিয়ে বরগুনা-১ আসন থেকে চারবার এমপি নির্বাচিত হন। গত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ আমলে খাদ্য উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে আসছি। বরগুনার জনগণকে একত্র করে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত করেছি। আমার ওপর প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আস্থা রেখে যতবার সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন, জনগণ তার প্রতিদান হিসেবে আমাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছে। আমি বরগুনার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।

বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেনের প্রতি জনসমর্থনও কম নয়। ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই থেকে স্থানীয় কোন্দলে দীর্ঘ ১২ বছর দলের বাইরে থাকার পর জেলা পরিষদ নির্বাচনে দেলোয়ার হোসেনকে দল মনোনয়ন দিলে দেশে দ্বিতীয় সর্বাধিক ভোটে তিনি নির্বাচিত হন। আগামীর প্রার্থিতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত বরগুনায় পরিবর্তন দরকার। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু মাঠের রাজনীতি করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছি। দলের কাছে মনোনয়ন চাইব, দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে নির্বাচন করব।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হলেও মো. দেলোয়ার হোসেনই এখন আওয়ামী লীগের অন্যতম কা-ারি। তিনি যখন এমপি তখন বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে যোগ দেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপি সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন বাতিল আইনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট করেন। মো. দেলোয়ার হোসেন আরো বলেন, ‘সারাজীবন বঞ্চিত মানুষের জন্য রাজনীতি করে আসছি, ভবিষ্যতেও বঙ্গবন্ধুর একজন সৈনিক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মী হিসেবে এ অঞ্চলের বঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করে যাব। আগামী দিনগুলোয়ও জনগণের সেবা করার জন্য দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। কারণ বরগুনার উন্নয়নে ও মানুষের মধ্যে আস্থা রাখতে এখন পরিবর্তন দরকার। আশা করি, দল মনোনয়ন দিলে বরগুনা এক আসনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এ আসনটি উপহার দিতে পারব।’

বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলহাজ মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, এখন বরগুনায় পরিবর্তন দরকার। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আওয়ামী লীগ করে আসছি। দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। দলের কাছে বিগত দিনও মনোনয়ন চেয়েছি, এবারো চাইব। আশা করি দল বিবেচনায় নেবে।

এদিকে পরিবর্তনের ডাক নিয়ে মাঠে নেমেছেন তরুণ মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। এরই মধ্যে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ। তিনি বলেন, ছাত্র রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছি। আওয়ামী লীগের আন্দোলন সংগ্রামে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি। নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে ছিলাম আছি। বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোয় সামনে থেকে নির্বাচন পরিচালনা করেছি। জনগণের কাছে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয়েছি। আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকের সম্মান অক্ষুণœ রাখার জন্য গত পৌর নির্বাচনে গুলি খেয়েছি। আশা করি দল মনোনয়ন দেবে।’

বরগুনা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, তাই বিএনপি চাইবে বরগুনার দুটি আসনই উদ্ধার করতে। এর মধ্যে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি মতিয়ার রমহান তালুকদার, সাবেক এমপি আলহাজ অধ্যাপক মো. আবদুল মজিদ মল্লিক অ্যাডভোকেট, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মো. ফিরোজ-উজ জামান মামুন মোল্লা, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা, বর্তমান সভাপতি মো. নজরুল মোল্লা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও কৃষক দলের আহ্বায়ক লে. কর্নেল (অব). আ. খালেক, তালতলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফরহাদ হোসেন আক্কাস মৃধা।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদার বলেন, বিগত ২০০১ সালে বরগুনা তিন আসন থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। শেখ হাসিনা সংসদীয় আসন ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই।

এদিকে বরগুনায় জাতীয় পার্টির নেই কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম। জাতীয় পার্টির বরগুনা জেলা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য জাফরুল আহসান ফরহাদের মৃত্যুর পর মাঠে নেই নেতাকর্মীরা। বরগুনায় এরশাদ সরকারের আমলে দাপিয়ে বেড়াত জাতীয় পার্টি। সেখান থেকে এখন দলের কর্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মাঝখানে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি রমরমা হলেও এখন নেই তার প্রভাব। দলীয় কোনো কাজ না থাকায় অফিসও খুলছে না কেউ। নেতাকর্মীরাও তাদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে পারে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান মুনসুর, তালতলী উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মো. খলিলুর রহমান। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে প্রার্থী হতে পারেন জেলা ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি মাওলানা ওলি উল্লাহ হোসাইন, সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহ আলম তালুকদার ও ড. মুফতি মাওলানা মাহবুবুর রহমান।

পিডিএসও/হেলাল