ঐক্যের প্রশ্নে ছাড় দেবে বিএনপি

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪২

বদরুল আলম মজুমদার

ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে বিএনপিকে অনেক ছাড় দিয়েই এগোতে হচ্ছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, বৃহত্তর ঐক্যের জন্য বিএনপি প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছে। জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে ঠিক কতটা ছাড় বিএনপি দিতে পারবে তা নিয়ে দলের মাঝে ভিন্নমত রয়েছে। দলের মাঝে এমন ভিন্নমতকে সামনে রেখে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।

গতকাল রাতে বিএনপির প্রতিনিধি দল ড. কামালের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়। গত নভেম্বরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে গিয়ে তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা নিয়ে গঠন হয় যুক্তফ্রন্ট। তখন জোটে দলের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল পাঁচটি। কিন্তু কামাল হোসেনের গণফোরাম যুক্তফ্রন্টে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ অবধি পিছিয়ে যায়। কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ যুক্তফ্রন্টের যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে। ড. কামাল হোসেন গণফোরাম নিয়ে জাতীয় ঐক্য পক্রিয়ার কথা বলে এগোতে থাকেন। এই ব্যনারে নিয়ে আসেন যুক্তফ্রন্টকেও। এখন এই পক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় রয়েছে বিএনপি।

তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা দিয়ে যুক্তফ্রন্টের দলগুলো বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। সর্বশেষ জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঐক্যপক্রিয়ার আত্ম-প্রকাশ, লক্ষ ও দাবি প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দেন বিএনপির হাইপ্রোপাইল নেতারা। যক্তফ্রন্ট গঠন করেই নিজেদের দাবি দাওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে থাকেন দলগুলোর নেতারা। বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করতে নেতারা বেশ কিছু শর্তের কথা তুলে ধরেন।

শর্তগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো ১. প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে জামায়াতকে ত্যাগ করা, ২. ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে ৩০০ আসনে মধ্যে ১৫০টি আসন ছেড়ে দেওয়া, ৩. মালয়েশিয়ান মডেলে দুই বছরের জন্য যুক্তফ্রন্টের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া, ৩. রাষ্ট্রীয় সুশাসন নিশ্চিত করা, ৪. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করা, ৫. প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস করাসহ রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার। তবে, এসব দাবি দাওয়ার বিষয়ে শুরু থেকে ড. কামাল হোসেন কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে, জামায়াতকে ছাড়ার ব্যপারে বিএনপির নেতারা কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এমনকি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেলখানায় সাক্ষাৎকালে মির্জা ফখরুলকে জোট অটুট রেখে ঐক্যের পথে এগোতে নির্দশনা দেন। সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যারাই মাঠে থাকবে তাদের সঙ্গেই থাকবে বিএনপি। সে যদি শয়তানও হয় তাতে আপত্তি করবে না দলটি। বিএনপির অন্য নেতাদের অবস্থান ও গয়েশ্বরের এমন কথার পর মূলত জামায়াত প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান অনেকটা পরিষ্কার করা হয়েছে। আর ঐক্যের নেতারাও জামায়াত প্রশ্নে কৌশলী বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। জামায়াতের যেহেতু নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে তাই ঐক্যর প্রশ্নে জামায়াত ইস্যু তেমন সমস্যা নয় বলে উভয় দলের নেতারা মনে করছেন। তবে ব্যতিক্রম চিন্তা করছেন বিকল্পধারা। তারা মনে করে ঐক্য করতে হলে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার ঘোষণা দিতেই হবে।

অন্য দাবি দাওয়া নিয়ে বিএনপি নেতারা প্রকশ্যে কোনো কথা না বললেও জোটের শরিক দলগুলো বেশ প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিএনপি নেতারা যুক্তফ্রন্টের ১৫০ আসনে ছাড়ের জবাবে শতাধিক আসনে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছেন বলে দলের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, যুক্তফ্রন্টের এসব দাবি দাওয়া নিয়ে গত একমাসে বিএনপিতে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং দলের মহাসচিব লন্ডন সফর কালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আলোচনা করেন। আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ায় দেশে ফিরে মির্জা ফখরুল ঐক্যের ব্যাপারে আরো বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেন। আলোচনা চলাকালীন গত এক সপ্তাহ ড. কামাল দেশের বাইরে থাকায় ঐক্য গঠনে গতি কিছুটা থমকে গেলেও পুনরায় আলোচনা শুরু হয়। তবে বিএনপির অধিকাংশ নেতা বিকল্প ধারার দিক থেকে ১৫০ আসন চাওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি।

আপাতত ১৫০ আসনের দাবি থেকে বিকল্প ধারা সরে না গেলেও যুক্তফ্রন্টের অন্য নেতারা জোর দিচ্ছেন ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর। এমন ভারসাম্যের ব্যাপারে বিএনপি তাদের উত্থাপিত ভিশন ২০৩০ তে তুলে ধরেছিল। তাই এই ইস্যুতেই আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে দুই পক্ষ থেকেই। এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহদুর রহমান মান্না প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমরা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছি। বিএনপির এমন একটি বিষয় তুলে ধরেছে আগেই। তাই আমরা এখন জানতে চাই, তারা এ নিয়ে কি চিন্তা করছে। যেহেতু ছাড় দিয়েও হলেও আমাদের সঙ্গে ঐক্য করতে চায় বিএনপি। অন্য আরো অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে আলোচনা ভালোভাবেই এগোতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে মাহীর পরে যুক্তফ্রন্টের আরেক ‘ফ্রন্ট লাইন’ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না দাবি তুলেন ক্ষমতা শেয়ারের। মালয়েশিয়ান মডেলে এ শেয়ার হবে পাঁচ বছরের অর্থেক সময় ভাগ করে। অর্থাৎ প্রথম দুই বছরের জন্য সরকারে থাকবেন ফ্রন্ট নেতারা। রাষ্ট্রপতি পদে থাকতে পারেন বিকল্পধারা সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী। যদিও বি চৌধুরী সাংবাদিকদের কাছে জানান, এমন চিন্তা তিনি করছেন না। তবে, বিএনপি নেতারা বলছেন, মালয়েশিয়া মডেল বলতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদে যথাক্রমে ড. কামাল ও বি চৌধুরীর কথাই বলা হচ্ছে। তবে এ নিয়ে বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে কোনো কথা না বললেও বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রধানমন্ত্রী পদে দুই বছরের জন্য ছাড় দিতে বিএনপির কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন শীর্ষ নেতারা। কারণ হিসেবে নেতারা বলছেন, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে এখনো জটিলতা কাটেনি। তিনি নির্বাচন করতে পারলে এককথা। আর যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তাহলে তার জায়গায় ড. কামালকে প্রধানমন্ত্রী পদে মানতে অসুবিধা নেই।

এসব শর্তের বাইরে অন্য যে শর্তগুলো যুক্তফ্রন্টের পক্ষ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে বিএনপি নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। তাই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ছাড়া অন্য শর্ত নিয়ে আলোচনা বিএনপির পক্ষ থেকে এগিয়ে নেওয়া তেমন সমস্যার নয় জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে যুক্তফ্রন্ট, গণফোরামসহ উদারপন্থি দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কোন কোন ইস্যুতে ঐকমত্য হবে সে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আরো হবে। রাজনৈতিক মেরূকরণের সময় অনেক ইস্যু ও প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তবে আমাদের এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তা না হলে এসব স্বপ্ন দেখে লাভ নেই।

এদিকে, বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা ড. কামাল শনিবারে দেশে এসে রোববারই একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের গুলশানের বাসায় দলটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ড. কামাল। সেখানে ঐক্যের পরবর্তী করণীয় ও দাবি দাওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন দুই দলের নেতারা।

পিডিএসও/তাজ