জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া

কাটছে না ধোঁয়াশা

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:১৪ | আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:১৯

প্রতীক ইজাজ

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে রাজনীতিতে। গত শনিবার রাজধানীতে ঐক্যের ব্যানারে নাগরিক সমাবেশের পর থেকেই এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যত কী, নেতৃত্ব কেমন হবে, লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্ন যেমন উঠেছে; তেমনি অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে ঐক্য প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়েও? এই প্রক্রিয়া কি নির্বাচনে অংশ নেবে আর নিলেও কীভাবে—সেটা যেমন পরিষ্কার নয়; তেমনি অস্পষ্ট এর রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচিও? বিশেষ করে এই প্রক্রিয়ার সাংগঠনিক রূপ কী হবে, নেতৃত্বই বা কারা দেবেন—স্বয়ং জোটের মধ্যে এ নিয়ে যেমন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে; তেমনি বিএনপি শেষ পর্যন্ত এই জোটের সঙ্গে যুক্ত হবে কি না—আর হলেও কোন প্রক্রিয়ায়, এ নিয়ে এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেই চলছে মতবিরোধ।

বিশেষ করে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে কী ভাবছে, ক্ষমতাসীনরা কীভাবে মোকাবিলা করতে চায় জোট রাজনীতি, সেসব নিয়েও শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা। নানা শর্ত ও সন্দেহের বেড়াজালে আবদ্ধ এই জোট কি শেষ পর্যন্ত টিকবে—সে নিয়েও যেমন ইতোমধ্যেই নানা সন্দেহ প্রকাশ করেছে নানা মহল; তেমনি প্রকৃতই এই জোট নির্বাচনমুখী রাজনীতি করতে চায়, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিকবহির্ভূত কোনো ষড়যন্ত্র আছে—উঁকি দিচ্ছে এমনতর নানা সংশয়ও।

জোটের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন মন্ত্রী ও দলের শীর্ষ নেতারা। বিশেষ করে এই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া সার্বিক রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে—সে দিকেই নজর ক্ষমতাসীনদের। আর ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির লক্ষ্য জোটকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী দাবি পূরণে আন্দোলন গড়ে তোলা। এ জন্য তারা ছাড় দিয়ে হলেও জোটের সঙ্গে থাকতে চায়। জোটকে দিয়ে দলীয় দাবি পূরণে সফল হতে চায় দলটি।

যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতৃত্বাধীন এই জোটের দিকে নজর রাখছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। তাদের মতে, যেসব আদর্শের কথা বলে জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, সেটি হলে সত্যিকার অর্থে দেশের রাজনীতির জন্য ভালো হবে। আর তা যদি না করে কোনো ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটে, তাহলে সেটি হবে পুরো দেশের জন্য ক্ষতিকর। তারা আশা করেন, এ প্রক্রিয়া বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বের করে এনে নির্বাচনে অংশ নিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তাহলে দেশের রাজনীতির জন্য কল্যাণকর হবে। একই সঙ্গে তারা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আর যদি তা না করে অন্য এই প্রক্রিয়া রাজনীতির বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করে, তাহলে সেটি হবে নেগেটিভ।

শনিবারের সমাবেশের পর থেকেই এই জোটের নানা দিক নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন ক্ষমতাসীনরা। বিশেষ করে সমাবেশে বিএনপি অংশ নেওয়ায় এই জোটের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। সর্বশেষ গত রোববার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে এক নাগরিক সংবর্ধনায় অভিযোগ করেন, বিএনপিসহ ‘দুর্নীতিবাজদের’ সঙ্গে নিয়ে কামাল হোসেন ও এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সরকার উৎখাতের চেষ্টা করছেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো তুলে ধরে তিনি যুক্তফ্রন্ট ও ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, এরা সব এক জায়গায়। কেউ সুদখোর, কেউ ঘুষখোর, কেউ মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত, কেউ খুনি। এভাবে সব আজকে এক জায়গায়। তিনি দুর্নীতিবাজদের নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোট নেতারা কীভাবে লড়াই করবেন, সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

এর আগে শনিবার নাগরিক সমাবেশের পরপরই সেতুমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সমাবেশে বিএনপি অংশ নেওয়ায় এই জোটকে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষকদের সাম্প্রদায়িক ঐক্য বলে অভিহিত করেন। তিনি এমনও বলেন, আওয়ামী লীগকে ছাড়া বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। যেখানে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ৬৬ পার্সেন্ট, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ৬৪ পার্সেন্ট, সেখানে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়। এমনকি ‘এই ঐক্য জগাখিচুড়ির ঐক্য। এটি বেশি দিন টিকবে না’ বলেও গতকাল মন্তব্য করেন তিনি। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম ‘ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা আবার মাঠে নেমেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে এই চিহ্নিত ব্যক্তিদের সামনে রেখে বিএনপি-জামায়াত জোট শনিবার তথাকথিত ঐক্যের মহড়া দিয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই অশুভ শক্তির চক্রান্ত প্রতিহত করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একইভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগসহ শরিক দলের শীর্ষ নেতারা জোটের নানা সমালোচনা করছেন। পাশাপাশি তারা এ বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, আন্দোলনের নামে জোট যদি কোনো ধরনের সহিংসতা বা বোমাবাজিতে নামে, তাহলে কোনো ধরনের ছাড় দেবেন না ক্ষমতাসীনরা।

অন্যদিকে স্বয়ং জোটসংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে জোটের স্থায়িত্ব ও বন্ধন নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। জোট সূত্র মতে, এই ঐক্য কতটুকু মজবুত, সে প্রশ্ন জোটের ভেতরই। নানা ফাঁক সেখানে। শুরু থেকেই জোটে জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। শনিবারের সমাবেশে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিক দলের নেতারা অংশ নেওয়ায় এখন ঐক্যের সঙ্গে জামায়াতের পরোক্ষ সংযুক্তির অভিযোগ করছেন জোটের সবাই। এমনকি বাইরেও এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন জোট নেতারা। একইভাবে ঐক্যে দলের অবস্থান নিয়ে বিএনপির ভেতরে বিভাজন স্পষ্ট। নেতৃত্ব ছাড়া বিএনপি অংশ নেবে কি না—সে প্রশ্নে এখন মুখোমুখি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াপন্থি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদ জিয়ার ছেলে তারেক রহমানপন্থি নেতারা।

প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচি নিয়েও। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জোটের বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়া ও আগামী ১ অক্টোবর থেকে ঐক্যের নেতারা দেশব্যাপী সভা-সমাবেশে যোগ দেবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও এসব ব্যাপারে কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকি এই ঐক্যের ভবিষ্যৎ কী? এই ঐক্য প্রক্রিয়া শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই থেমে যাবে, নাকি ভবিষ্যতেও দেশের রাজনীতিতে বড় একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে—সে নিয়ে সদুত্তর নেই স্বয়ং জোট নেতাদের মধ্যেও। এই জোট ক্ষমতায় গেলে কে হবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, জামায়াতে ইসলামীকে জোট থেকে বাদ দিয়ে এই জোটে বিএনপিকে অংশ নেওয়াতে পারবে কি না—জোট আনুষ্ঠানিক রূপ নিলে কে হবেন জোটের প্রধান—এসব নিয়ে এখনই জোটের মধ্যে অনৈক্য দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ অবশ্য নতুন এ জোটকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা জানিয়েছেন। নেতারা বলেন, কয়েকজন ‘জনবিচ্ছিন্ন ও রাজনীতি থেকে পরিত্যক্ত’ রাজনীতিক দিয়ে গড়া এ জোট নিয়ে জাতির মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এরা জাতীয় জীবনে বা জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি; আগামীতেও পারবেন না। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার দাবিকে ‘বেআইনি’ উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘সংবিধানের মধ্য থেকে নির্বাচন করার বিষয়ে আমাদের যে অবস্থান, তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে না।’ এ জোটকে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ ছাড়া অন্য কিছু ভাবছে না দলের নেতারা। একইভাবে জোটের নেতারা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পাঁচ দফা দাবিকে বিএনপি-জামায়াতের দুষ্কর্ম রক্ষার ঢাল হিসেবে দেখছেন।

তবে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও জোটকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছে বিএনপি। দলের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল থাকায় এই জোটের ওপর নির্ভর করেই আন্দোলনে নামতে চাইছে দলটি। এই জোটে জায়গা পেতে প্রয়োজনে আগামী নির্বাচনে দল অনেক ছাড় দেবে বলেও জানান নেতারা। দলীয় সূত্র মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এবার নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। প্রয়োজনে জাতীয় ঐক্য হলে তাদের বেশিসংখ্যক আসন ছাড় দেবে। যদিও খালেদা জিয়া দলের মহাসচিবকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের দিকেই বেশি নজর রাখতে বলেছেন।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, এই ঐক্য প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী, তা এখনই বলা যাবে না। যেহেতু নির্বাচনের আগে এই জোট, তাই তারা নির্বাচনী সুবিধা নিতে চায়। তবে এই জোট যদি বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়াতে পারে তাহলে এই ঐক্য প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে। আর যদি তা না করে রাজনীতির বাইরে অন্য কিছুর চিন্তাভাবনা করে, তাহলে সে ফল ভালো হবে না।

পিডিএসও/হেলাল